রবিবার ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ইং

৩০৩ কলেজের সরকারিকরণ আটকে আছে নথি যাচাইয়ে

ডিসেম্বর ১১, ২০১৯ | ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ

তুহিন সাইফুল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এ বছরও শেষ হলো না আত্তীকৃত কলেজ সরকারিকরণের কাজ। অথচ ২০১৬ সালে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে তিন বছর। ২০২০ সালের প্রথম ছয় মাসে কাজটি শেষ হবে কি না— সে বিষয়েও নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরে (মাউশি) খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগামী ১২ ডিসেম্বর নির্বাচিত কলেজগুলোর প্রাপ্যতা যাচাই-বাছাই শেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নথি-পত্র পাঠাবে তারা। তাদের পাঠানো নথিপত্রে কাজ করবে মন্ত্রণালয়। এরপর সেগুলো পাঠানো হবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। সেখানে যাচাই শেষে ২০২০ সালের কোনো একসময় আসবে কলেজগুলোর সরকারিকরণের ঘোষণা।

মাউশিতে কলেজ সরকারিকরণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছেন কলেজ বিভাগের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক শাহেদুল খবীর চৌধুরী। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, কলেজ সরকারিকরণের জন্য যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি অনেক জটিল। দলিলপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি আমাদের প্রতিটি কলেজ ক্যাম্পাসই পরিদর্শন করতে হয়েছে। কোথাও যেন সামান্যতম ভুলও না হয়, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নির্দেশনা রয়েছে। আমরাও সেভাবেই কাজ করছি।

বিজ্ঞাপন

সরকারিকরণের কাজটি কবে শেষ হবে— এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক শাহেদুল খবীর বলেন, আমাদের অংশের কাজ শেষ হয়ে গেছে। ১২ তারিখে মন্ত্রণালয়ের কাছে আমরা তথ্য-উপাত্ত জমা দেবো। এরপরের দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের। তারা কাজটি কবে শেষ করবেন, সেটি আমরা বলতে পারব না।

সরকারি কলেজ না থাকা উপজেলাগুলোতে একটি করে কলেজ ও একটি করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে সরকারি করার কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। এরপর প্রায় তিনশ মাধ্যমিক বিদ্যালয় সরকারি হয়ে গেছে। তবে ৩০৩টি কলেজ সরকারিকরণের কাজ এখনো নথিপত্র যাচাইয়েই আটকে আছে এই তিন বছরে। এতে করে নির্বাচিত কলেজগুলোর শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা পড়েছেন বিপাকে।

এদিকে, কলেজ আত্তীকরণের ঘোষণা হওয়ার পর নির্বাচিত কলেজগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। কিন্তু তিন বছরে এসব কলেজ থেকে অবসরে গেছেন অনেক শিক্ষকই! ফলে আগে থেকেই শিক্ষক সংকটে থাকা এসব কলেজে নিয়মিত পাঠদান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আত্তীকৃত কলেজের একজন অধ্যক্ষ সারাবাংলাকে বলেন, গত তিন বছরে আমার কলেজ থেকে সাত জন শিক্ষক অবসরে গেছেন। তারা প্রত্যেকেই ভালো ও জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু এই সময় নিয়োগ না হওয়ায় তাদের শূন্যস্থান পূরণ করা যাচ্ছে না। কলেজের গণ্ডি পার হয়ে শিক্ষার্থীরা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি লড়াইয়ে অংশগ্রহণের আত্মবিশ্বাসও হারাচ্ছে। এ ক্ষতি অপূরণীয়।

মফস্বলের পঞ্চাশোর্ধ এই অধ্যক্ষ আরও বলেন, সংশ্লিষ্টরা কাজটিকে যতটা জটিল বলছেন, এটি আসলে ততটা জটিল নয়। আমার মনে হয় তারা কাজটি করতে আন্তরিক নয়। ৩০৩টি কলেজ সরকারিকরণের জন্য তিন বছর অনেক বেশি সময়। অথচ এতটা সময় পেয়েও তারা কাজটি শেষ করতে পারেনি। আমি মনে করি, এর মাধ্যমে কলেজ সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি পরিবারের সঙ্গে অবিচার করছে কর্তৃপক্ষ।

এই অধ্যক্ষের বক্তব্যের সত্যতা খতিয়ে দেখতে গিয়ে জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আত্তীকরণের জন্য জমা হওয়া ফাইলের স্তূপ একটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সমান উঁচু হয়েছে। কিছু ফাইল জমা আছে মাউশিতেও। যদিও সরকারিকরণের কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের নিয়মিতই তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। এমনকি তিনি নিজে মাউশিতে গিয়েও খোঁজখবর নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ গোলাম ফারুক।

মাউশি প্রধান সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে কাজটি শেষ করছি। শিক্ষামন্ত্রী নিজে দায়িত্ব নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন।’ কলেজ সরকারিকরণের কাজটি অনেক বিশাল পরিসরে হচ্ছে বলেই ‘সামান্য’ দেরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি সারাবাংলাকে বলেন, শিক্ষার পরিবেশ ফেরাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বছর বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে। কলেজ সরকারিকরণের কাজটিও আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে করছি। এ কাজটি দ্রুত শেষ করতে প্রয়োজনীয় লোকবল ও অন্যান্য সহায়তাও দেওয়া হয়েছে। কাজটি দ্রুতই শেষ হবে।

কলেজ সরকারিকরণের কাজটি দ্রুত শেষ না হওয়ার কারণ হিসেবে ২০১৬ সালের ‘নো বিসিএস নো ক্যাডার’ আন্দোলনকে দায়ী করছেন অনেকে। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সে বছরের ডিসেম্বরে বিসিএস শিক্ষা সমিতির মহাসচিব মো. শাহেদুল খবীর চৌধুরী ও মো. মঈনুল হোসেন আদালতে একটি রিট করেন। এর ফলে দুই বছরেরও বেশি সময় কাজটি বন্ধ থাকে।

পরে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই নতুন সরকারি করা কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা-২০১৮ জারি করা হয়। এতে বলা হয়, নতুন সরকারি হওয়া কলেজ শিক্ষকরা নন-ক্যাডার মর্যাদা পাবেন। এরপরই ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের আদেশ (জিও) জারি করা হয়।

এদিকে, আত্তীকরণ হওয়া কলেজ নিয়ে জটিলতার মধ্যেই সরকারি হওয়ার সংবাদ পেয়েছে আরও দু’টি বেসরকারি কলেজ। কলেজ দু’টি হলো— রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী গালর্স কলেজ ও নাটোরের লালপুর উপজেলার গোপালপুর ডিগ্রি কলেজ। এজন্য গত অক্টোবরে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজের নিয়োগ ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং গোপালপুর ডিগ্রি কলেজ সরকারিকরণের বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে মতামত নিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

সারাবাংলা/টিএস/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন