বিজ্ঞাপন

আম হইলে লক্ষ্মণভোগ, ডায়াবেটিস ‘সামান্য রোগ’!

June 25, 2021 | 8:01 am

মো. আশরাফুল ইসলাম, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট

চাঁপাইনবাবগঞ্জ: চলছে ফলের রাজা আমের ভরা মৌসুম। সবাই যখন আমের সুমিষ্ট আমের স্বাদে মজে থাকবেন, তখন ডায়াবেটিস রোগীরা নিজেদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে নানাকিছু ভাবেন। তাই বলে কি আম খাওয়া বাদ দেওয়া যায়? আর তাই সুমিষ্ট আমের স্বাদ নিতে বিকল্প খুঁজে বের করেছেন ডায়াবেটিস রোগীরা। সম্প্রতি ডায়াবেটিস রোগীরা ঝুঁকছেন বারি-২ বা ‘লক্ষ্মণভোগ’ আমের দিকে। অন্য আমের তুলনায় কম মিষ্টি বা সুগারের পরিমাণ কম, দেখতে ও গন্ধে খুব ভালো হওয়ায় স্বাস্থ্য সচেতনদের কাছে প্রথম পছন্দ এখন লক্ষ্মণভোগ আম।

বিজ্ঞাপন

চিকিৎসকরা বলছেন, আমের সুগার প্রাকৃতিক হলেও বেশি খাওয়া উচিত নয়। এটি রক্তের সুগার লেভেলের জন্য ক্ষতিকর। গ্লুকোজ লেভেলেও প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে, বাজারে গোপালভোগ, ক্ষীরসাপাত, ল্যাংড়া, ফজলি আমের মিষ্টতা বেশি থাকায় সাধারণত ডায়াবেটিকস রোগীরা এসব আম খাওয়া থেকে বঞ্চিত হন।

অপরদিকে, লক্ষ্মণভোগ আমে রঙ, আকৃতি, গুণ ও স্বাদ তুলনামূলক ভালো এবং মিষ্টতা কম। তাই অনেকেই এখন এই জাতের আমকে ‘ডায়াবেটিস আম’ও বলে ডাকছেন।

বিজ্ঞাপন

আম গবেষকদের মতে, লক্ষ্মণভোগ আম হচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা থেকে আসা আমের একটি জাত। পশ্চিমবঙ্গ সরকার সর্বপ্রথম লক্ষ্মণভোগকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিকারক জাত হিসাবে বেছে নিয়েছিল। তাই মালদায় লক্ষ্মণভোগকে সেখানকার শ্রেষ্ঠ আমের জাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এমনকি ভারতের জাতীয় আম উৎসবে সেরা আম হিসেবেও স্বীকৃতি পায় লক্ষ্মণভোগ।

মালদার পার্শ্ববর্তী এলাকা ও বাংলাদেশের আমের রাজধানীখ্যাত জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জেও চাষকৃত আমের কয়েকটি প্রধান জাতের মধ্যে রয়েছে লক্ষ্মণভোগ। জেলার সদর, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট, নাচোল ও গোমস্তাপুর উপজেলার কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে লক্ষ্মণভোগ আমের গাছ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আম হইলে লক্ষ্মণভোগ, ডায়াবেটিস ‘সামান্য রোগ’!

তবে কি পরিমাণ জমিতে লক্ষ্মণভোগের চাষাবাদ হয়েছে, এবিষয়ে কোনো তথ্য নেই কৃষি বিভাগের কাছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্থানীয়ভাবে লক্ষ্মণভোগ আম ‘লখনা’ নামেই বেশি পরিচিত।

বিজ্ঞাপন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ বলেন, ‘গত ১০-১২ বছর ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছি। নিজের বাগানের প্রচুর আম বাড়িতে নষ্ট হয়। খেতে পারি না, ডায়াবেটিসের ভয়ে। তবে এক ভাতিজার পরামর্শে গতবছর থেকে লক্ষ্মণভোগ আম দুই-একটা করে খাচ্ছি। আমটা একটু মিষ্টি কম হলেও এর সুঘ্রাণ অন্য সব আমের থেকে বেশি। পাকলে টকটকে হলুদ রং ধারণ করে। যা সব মানুষকেই আকর্ষণ করে।’

ফার্মেসি দোকানদার আব্দুল মান্নান (৪৫) বলেন, ‘প্রায় ৭০ ভাগ মানুষই সুগারের আতঙ্ক নিয়ে চলাফেরা করে। ফার্মেসি থাকার সুবাদে জানি, কত মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছে। আমি নিজেও চিনিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। তবে মিষ্টি কম হওয়ার কারণে মাঝেমধ্যে লক্ষ্মণভোগ আম খাই।’

বিজ্ঞাপন

দেশের সবচেয়ে বড় আমবাজার কানসাটের আড়তদার ও মেসার্স ডিয়ার ফল ভান্ডারের মালিক দোস্ত মোহাম্মদ দোসু জানান, বর্তমানে বাজারে লক্ষ্মণভোগের দাম চলছে মণে (৪০ কেজিতে) ৭০০-৮০০ টাকা। বাজারে চাহিদা থাকলেও এখন ক্ষীরসাপাত আমের ভরা মৌসুম থাকার কারণে দাম অনেক কম রয়েছে। আগামী সপ্তাহে লক্ষ্মণভোগ আমের দাম কিছুটা বাড়তে পারে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. গোলাম রাব্বানী জানান, লক্ষ্মণভোগ আমে সুগার নেই বা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য অসুবিধার কারণ নেই বিষয়টি এমন নয়। তবে এই আম কিছুটা মিষ্টি কম হওয়ায় তা অন্য আমের তুলনায় ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সুবিধাজনক। তবে খাওয়ার পরিমাণ অব্যশই পরিমিত হতে হবে।

আম হইলে লক্ষ্মণভোগ, ডায়াবেটিস ‘সামান্য রোগ’!

আম গবেষকদের মতে, লক্ষ্মণভোগ আমের আঁশ খুবই কম। এর রঙ ও গন্ধ অসাধারণ। খোসা কিছুটা মোটা হলেও আঁটি পাতলা। আম দ্রুত পচনশীল ফল হলেও অন্যান্য জাতের তুলনায় লক্ষণভোগ অধিক সময় ধরে সংরক্ষণ করা যায়। এমনকি লক্ষ্মণভোগ আম পাকার পরেও ৮-১০ দিন ভাল থাকে। এই আমটি ওজনে ১৫০-৮০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। হালকা মিষ্টি ও অন্যান্য আকর্ষণীয় গুণাবলির কারণে বিদেশিদের পছন্দের শীর্ষে লক্ষ্মণভোগ। এই আমের প্রায় ৭৫ ভাগ অংশই ভক্ষণযোগ্য।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব আম গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অন্য আমের তুলনায় ৫-১০ শতাংশ কম মিষ্টি ডায়াবেটিস রোগীদের খুব পছন্দের জাত লক্ষ্মণভোগ। আমটির সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হচ্ছে এর সংরক্ষণ ক্ষমতা। গাছ থেকে পাড়ার পর ৮-১০ দিন পর্যন্ত সহজেই এ আম রাখা যায়। এসব গুণাবলির কারণেই লক্ষ্মণভোগকে রফতানিযোগ্য ফল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিরূপ আবহাওয়াতেও ভালো ফলন দেয় লক্ষণভোগ।’

আম চাষি, ব্যবসায়ী, রফতানিকারক ও গবেষকদের দাবি, রফতানিতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ আম চাষের প্রসার ঘটানো ও এ আম রফতানি করে দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

উল্লেখ্য, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচ উপজেলায় এবছর প্রায় ৩৪ হাজার ৭৩৮ হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে। এসব আম বাগানে প্রায় ২৭ লাখ গাছ থেকে আড়াই লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ।

সারাবাংলা/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন