বিজ্ঞাপন

তিউনিসিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা; নেপথ্যে কী?

July 31, 2021 | 4:37 pm

মো. নজরুল ইসলাম

আরব বসন্তের সূতিকাগার তিউনিসিয়ায় নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে। আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর-পূর্বে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী এই দেশটিতে ২০১১ সালে আরব বসন্তের সূত্রপাত হয়। এই বসন্তের ছোঁয়ায় আরব দেশগুলোতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পালে গণতন্ত্রের হাওয়া লাগে। দীর্ঘদিনের একনায়কতন্ত্রের গেঁড়াকল থেকে মিশর ও লিবিয়ার মতো দেশগুলো মুক্তি লাভ করে। জর্ডান, ইয়েমেন, সিরিয়াসহ কয়েকটি দেশেও রাজনৈতিক পুনর্জাগরণ ঘটে। কিন্তু যে দেশটি পুরো আরব বিশ্বের রাজনীতিতে বসন্তের আগমন ঘটালো, সেই দেশটিতে রাজনৈতিক সংকট লেগেই আছে। ২০১১ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত নয় বার সরকার পরিবর্তিত হয়েছে সেদেশে। গত ২৫ জুলাই প্রেসিডেন্ট কায়েস সাঈদ ইন্নাহদা পার্টির প্রধানমন্ত্রী হিশেম মেচিচি ও তার পার্লামেন্ট স্থগিত করেন এবং এক মাসের রাত্রিকালীন কারফিউ জারি করেন। যে কারণেই তিউনিসিয়া বৈশ্বিক রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

তিউনিসিয়াকে আরব বসন্তের অন্যতম সফল দেশ বলা হলেও আদতে সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিশেম মেচিচিকে এই অস্থিতিশীলতার বলি হতে হলো। তবে বলা যায় সরকার পতনের বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেমন, চলমান অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, করোনা মহামারি প্রতিরোধে ব্যর্থতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও দ্বৈত নির্বাহী ব্যবস্থা এবং ভূরাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।

তিউনিসিয়া একটি দরিদ্র দেশ। দেশের অর্থনীতির অবস্থা এমনিতেই খারাপ, গত কয়েক মাসে অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। অর্থনীতির এই স্থবিরতার প্রভাব গভীর ও সুদূরপ্রসারী। দেশটিতে বিপুল-সংখ্যক বেকার বিদ্যমান। বিপ্লবের পর থেকেই লোকজন কাজ পাওয়ার অপেক্ষায় আছে, কিন্তু অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর তেমন কোনো সমাধান হয়নি। মহামারির আগে থেকেই তিউনিসিয়ার অর্থনীতিতে সমস্যা চলছিল। মহামারি শুরু হওয়ার পর তা দেশটির জাতীয় অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র ও স্থানীয় ব্যবসার ওপর গুরুতর আঘাত হানে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিউনিসিয়ায় বেকারত্বের হার বেড়ে ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব ২০২০ সালের শেষ নাগাদ ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। তিউনিসিয়ার অর্থনীতির একটি অন্যতম প্রধান খাত ছিল পর্যটন। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে তাতে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। ম্যানুফ্যাকচারিং খাতও গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহামারির কারণে তিউনিসিয়ার পর্যটন খাতে ধস নেমেছে, এর ফলে ২০২০ সালে তিউনিসিয়ার অর্থনীতি ৯ শতাংশ সংকুচিত হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

এছাড়া করোনা মহামারি রোধে দেশটির সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যদিও পৃথিবীর কোনো দেশই কোভিড প্রতিরোধে শতভাগ সাফল্য লাভ করতে পারেনি, কিন্তু এই নির্জলা সত্যটুকু তিউনিসিয়ার জনগণ হয়তে আমলে নেয়নি। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে ১৯ হাজারের অধিক মানুষ মারা গেছে সেদেশে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, পুরো আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে জনসংখ্যার অনুপাতে কোভিড মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি তিউনিসিয়ায়। প্রায় এক কোটি ২০ লাখের কাছাকাছি জনসংখ্যার মধ্যে মাত্র ৮ শতাংশ মানুষকে এ পর্যন্ত ভ্যাকসিন দিতে পেরেছে দেশটির সরকার।

চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও করোনা মহামারিতে মৃত্যু; সব কিছুর জন্য সরকারকে দোষারোপ করা হয় এবং জনগণের মধ্যে চরম অসন্তোষ দানা বাঁধে। এক পর্যায়ে জনগণ রাজপথে সরকার পতনের আন্দোলনে নেমে পড়ে। আর এই জনরোষকে কাজে লাগান প্রেসিডেন্ট কায়েস সাঈদ। তিউনিসিয়া সরকার ব্যবস্থা মূলত ডুয়েল এক্সিকিউটিভ সিস্টেম বা সেমি-প্রেসিডেনশিয়াল সিস্টেমের অন্তর্গত। অর্থাৎ, এখানে প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা প্রায় সমান। তবে এখানে কমান্ডার ইন চিফ হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট, অর্থাৎ সামরিক বাহিনী প্রেসিডেন্টের অধীনে থাকে।

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ ভূরাজনৈতিক হস্তক্ষেপও আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত তিউনিসিয়া উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত ছিল। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান সাম্প্রতিক সময়ে মুসলমানদের একীভূতকরণ ও তাদের স্বার্থ রক্ষায় বেশ উদ্যোগী। ফলে এরদোগান আরব বিশ্বের দেশগুলোর প্রতি বেশি আগ্রহী এবং বন্ধুভাবাপন্ন। অবশ্য তুরস্ক কাতারকে সঙ্গে নিয়ে একটি বলয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় রয়েছে। অপরদিকে, ফিলিস্তিনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ, মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড, তিউনিসিয়ার ইন্নাহদা পার্টিগুলোকে পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে। মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড পুনরায় ক্ষমতায় আসুক এবং তিউনিসিয়ায় ইন্নাহদা পার্টি ক্ষমতায় থাকুক এটা তারা চায় না।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়া পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এগিয়ে চলছে। ২০১৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে এক সাক্ষাৎকারে অবশ্য এ কথাও বলেছেন যে, এরদোগানকে গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতাচ্যুত করবেন। অর্থাৎ, তারা সরাসরি বা আর কোনো দেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করবে না। বরং যেসব দেশে মার্কিন নীতি বিরোধী সরকার থাকবে সেসব দেশের বিরোধী দলগুলোকে বিভিন্ন সহযোগিতা প্রদান করে ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটাবেন। অবশ্য সে পথেই হাঁটছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার এবং ইরাক থেকে সৈন্য সরানোর ঘোষণা; সেদিকেই ইঙ্গিত দেয়। মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং ফ্রান্সকে সঙ্গে নিয়ে একটি তুরস্ক-বিরোধী বলয়ের ভিত শক্ত করে চলেছেন বাইডেন। আপাতদৃষ্টিতে আমাদের ভাববার যথেষ্ট খোরাক যোগাবে যে, তিউনিসিয়ার ইন্নাহদা পার্টির পতন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা ও নীতির একটি বহিঃপ্রকাশ কি-না! আর তাই যদি হয় তাহলে এর পরের শিকার কি তুরস্ক ?

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/আইই

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন