শুক্রবার ১৯ জুলাই, ২০১৯ ইং , ৪ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

মেলা ঘুরে পাঠকেরা কিনছেন মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত বই

ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৯ | ১০:৫৫ অপরাহ্ণ

।। হাসনাত শাহীন, বইমেলা থেকে ।।

ঢাকা: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জীবনে আনন্দ-বেদনার এক ঐতিহাসিক ঘটনা। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সংঘটিত মহান এই মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি অর্জন করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। যে কারণে বাঙালির জীবনে আনন্দ-বেদনার এই ঐতিহাসিক মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। আর, এ জন্যই আবেগ অহঙ্কারে মিশে থাকা বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল এই মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু’কে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে লিখিত হয়েছে-কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ইতিহাসসহ নানা ধরনের বই। প্রতিবছর গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু’কে নিয়ে নানা বই। এবছরও তার ব্যতয় হয়নি; এবারের বইমেলাতেও মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু’কে নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য বই।

প্রকাশকরা বলছেন, ‘গল্প, উপন্যাস ও ও গোয়েন্দা কাহিনীর বইয়ের পাশাপাশি পাঠকদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের চাহিদাও বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের অনেকেই স্টল ও প্যাভিলিয়ন ঘুরে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত বই কিনছেন। প্রতিবছরই গুরুত্ব বাড়ছে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত বইয়ের। এ ধরনের বইগুলোর প্রতি বিভিন্ন বয়সী মানুষের ভেতরে তৈরি হয়েছে অন্যরকম আগ্রহ, বাড়ছে পাঠকও।’

গ্রন্থমেলার শুরু থেকে ২৪তম দিন পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ স্টল ও প্যাভিলিয়নে সাজানো রয়েছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই। মুক্তিযুদ্ধের অজানা ইতিহাস, যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকথন, যুদ্ধের ভয়াবহতা, পাকিস্তানিদের বর্বরতা, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গবেষণা, প্রবন্ধ, ইতিহাস রচনা, উপন্যাস, গল্প, কবিতার বই প্রকশিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা অনেক ধরনের বই।

বিজ্ঞাপন

সময় প্রকাশনের প্রধান নির্বাহী ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থের সবচেয়ে বড় ক্রেতা তরুণ ও কিশোররা। মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক রচনার প্রতি সব বয়সী পাঠকের আগ্রহ থাকলেও নবীনদের আগ্রহের মাত্রাটা অনেক বেশি। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা উপন্যাসের চাহিদাও রয়েছে।’

আগামী প্রকাশনীর প্রধান নির্বাহী ওসমান গনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের বই শুধু ইতিহাস সংরক্ষণ করে না, জাতিকে অনুপ্রেরণাও দেয়। তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে, তাদের অনুপ্রাণিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক লেখালেখির।’

অন্বেষা প্রকাশনা সংস্থার সত্ত্বাধিকারী শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘উপন্যাস, গল্প আর কবিতার বই সব সময় বেশি বিক্রি হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের পছন্দ, বদলে যাচ্ছে পাঠকের রুচিবোধ। এখন বিষয়ভিত্তিক বইয়ের প্রতিও ঝুঁকছে পাঠকরা। তরুণদের মধ্যে এখন মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা বইয়ের যেমন চাহিদা বেড়েছে; তেমনই, সম্প্রতি প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা বইয়েরও কদর অনেক বেড়েছে।’

ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বিক্রয় প্রতিনিধিরা জানান, গ্রন্থমেলায় তাদের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর লেখা বই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। এরপরই রয়েছে ‘মূলধারা ৭১’। বাংলা একাডেমির প্যাভিলিয়ন থেকে জানানো হয়, তাদের বিক্রির শীর্ষে রয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘কারাগারের রোজনামচা’। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইয়ের চাহিদাও বেড়েছে।

গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিছু বই
আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে মেজর জেনারেল কে এম সাইফুল্লাহর ‘১৯৭১: মাই ডাইরি, হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘মুক্তিযুদ্ধ’, আলী মো. আবু নাঈম ও ফাহিমা কানিজ লাভা সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প, রফিকুল ইসলামের ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ, আসাদুজ্জামানের ‘মুক্তিসংগ্রাম সমগ্র’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধ সমগ্র’, মো. মোজাম্মেল হকের ‘ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সংগ্রাম বন্দী জীবন’, মিলটন রহমানের ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ এবং মননশীল লেখক ও গবেষক রফিকুল ইসলামের ‘বীরের এ রক্তস্রোতে মাতার এ অশ্রুধারা’; ১৯৭৩ সালে প্রথম প্রকাশিত এই বইটি দীর্ঘদিন পর বর্ধিত কলেবরে প্রকাশিত হয়েছে।

কাকলী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে লেখক-গবেষক শামসুজ্জামান খানের ‘লেখক বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য’ ও গবেষক অ্যালভিন দীলিপ বাগচীর পাঁচ খন্ডের গবেষণা গ্রন্থ ‘বাঙলার স্থপতি’। যে বইটিতে বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত উপমহাদেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিভাবে জড়িয়ে ছিলেন সেসব বিষয় ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়কে তুলে ধরা হয়েছে। একত্রে পাঁচ খণ্ডের এই গবেষণা গ্রন্থের মূল্য ৩ হাজার ১০০ টাকা।

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড প্রকাশ করেছে লেখক ও গবেষক মুনতাসীর মামুনের ইংরেজিতে লেখা ‘জয় বাংলা’, লেখক ও গবেষক সালেক খোকনের ‘রক্তে রাঙা একাত্তর’, সুজাতা আজিমের ‘শিমুলির একাত্তর’ ও মাহবুব রেজার ‘যুদ্ধে যাবার দিন’ এবং মঞ্জু সরকারের শিশুতোষ বই ‘ডিজিটাল দীপু আর মুক্তিযোদ্ধা দাদু’। কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে লেখক গবেষক শামসুজ্জামান খানের দু’টি বই ‘বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা ও বর্তমান বাংলাদেশ’ ও ‘শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা’, সালেক খোকনের ‘১৯৭১ : যাঁদের ত্যাগে এলো স্বাধীনতা’ এবং স.ম শামসুল আলমের ‘মুক্তিযুদ্ধের ছড়া-কবিতা’।

অন্বেষা থেকে প্রকাশিত হয়েছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ‘বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য’, সাইদ হাসান দারা’র ‘শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত’ ও শামস সাইদের ‘ধানমন্ডি ৩২ নম্বর : গণঅভ্যুত্থান পর্ব’। রোদেলা থেকে প্রকাশিত হয়েছে খায়রুল আলম মনিরের ‘পাকিস্তানের রাজনীতিতে আইয়ুব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো-মুজিব’ এবং নির্মল রোজারিও ও রঞ্জনা বিশ্বাসের যৌথ গবেষণা গ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধে খ্রিস্টান সম্প্রদায়’।

সময় প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে লেখক ও গবেষক মুনতাসীর মামুনের ‘ভিনদেশিদের মুক্তিযুদ্ধ’; একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে সারা বিশ্বেই জনমত গড়ে উঠেছিল। বিদেশি বন্ধু ও সুহৃদরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। বইটিতে উঠে এসেছে তার গুরুত্বপূর্ণ ও তথ্যনিষ্ঠ বিবরণ। এছাড়াও সময় এনেছে ড. চৌধুরী শহীদ কাদেরের ‘মুক্তিযুদ্ধে ভারতের চিকিৎসা সহায়তা’ ও মাসুদা ভাট্টি’র ‘বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ব্রিটিশ দলিলপত্র’।

এছাড়াও বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অন্যান্য বই। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা শাহাবুদ্দিন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ ‘আমার মুক্তিযুদ্ধ’, অনন্যা থেকে প্রকাশিত হয়েছে ইমদাদুল হক মিলনের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস ‘একাত্তর ও একজন মা’, অবসর থেকে প্রকাশিত হয়েছে-মার্জিয়া লিপির ‘একাত্তর মুক্তিযোদ্ধার মা’, প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা প্রকাশ করেছে এ কে এম মাহনাওয়াজের দু’টি বই-‘কিশোরদের বঙ্গবন্ধু : বড় মানুষের গল্প’ ও ‘৭ মার্চের ভাষণ : বিশ্ব ঐতিহ্য দলিল’, তাম্রলিপি থেকে প্রকাশিত হয়েছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘রাজাকার ইজ্জত আলীর জীবনের একদিন’ ও তাহমিনা বেগমের ‘কিশোরীর যুদ্ধদিনের স্মৃতি’, অধ্যয়ন থেকে প্রকাশিত হয়েছে রাদিন চৌধুরীর ‘মুক্তিযুদ্ধের সহজ পাঠ’, আবিষ্কার থেকে প্রকাশিত হয়েছে-নীরা লাহিড়ী’র মুক্তিযুদ্ধে শহিদ এক নারীযোদ্ধার আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘মুক্তিযোদ্ধা নীপা’, প্রথমা প্রকাশনী প্রকাশ করেছে-আনিসুল হকের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস ‘এই পথে আলো জ্বেলে’, মুহাম্মদ লুৎফুল হক সম্পাদিত ‘ যুদ্ধগাথা ১৯৭১: ২৬টি বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের বয়ান’ ও রওশন আরা খানমের ‘শহীদ বদি ও আমার স্মৃতিতে একাত্তর’।

পার্ল পাবলিকেশন্স প্রকাশ করেছে মোস্তফা কামালের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘অগ্নিমানুষ’, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ প্রকাশ করেছে হাসান ফেরদৌসের ‘যুদ্ধের আড়ালে যুদ্ধ’, আলোঘর প্রকাশনা এনেছে সৈয়দ নুরুল আলমের ‘এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধা’, আহমেদ রিয়াজের ‘একাত্তরের কমলপ্রভা’ মুনতাসীর মামুনের ‘জয়বাংলা যেভাবে ছিনতাই হয়ে যায়’, এম এ মোমেনের ‘একাত্তরের ইন্দিরা ও প্রিয়দর্শিনী গান্ধী’, মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশ করেছে খ্যাতিমান ফটোসাংবাদিক পাভেল রহমানের ‘আমার মুক্তিযুদ্ধ’, দি স্কাই পাবলিশার্স এনেছে হাবিবুর রহমান খানের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ’।

পুঁথিনিলয় থেকে বেরিয়েছে ডা. প্রণব কুমার চৌধুরীর ‘মুক্তিযুদ্ধ আমার শৈশব’, জলতরঙ্গ এনেছে সোলায়মান শিপনের ‘জেনোসাইড’, শ্রাবণ প্রকাশনী এনেছে অমল সাহার ‘ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’, বটেশ্বরর বর্ণন এনেছে মিজান সরকারের ‘কুষ্টিয়ার মুক্তিযুদ্ধ: আঞ্চলিক তথ্য’, ও জিয়াউল হকের ‘ শত মুক্তিযোদ্ধার বিজয়গাথা’, বেহুলা বাংলা প্রকাশ করেছে-ইমাম মেহেদীর ‘মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়ার নারী’ ও ‘১৯৭১ ডাঁশার চাষীক্লাব যুদ্ধ’, বলাকা প্রকাশনী এনেছে-শরীফা বুলবুলের ‘অপারেশন ১৯৭১’, জার্নিম্যান বুক্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে এইচ টি ইমামের ‘স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু : প্রাসঙ্গিক ভাবনা’ ও বঙ্গবন্ধুর ছয় আন্দোলনের বিষয় নিয়ে টিটু চৌধুরী’র ইংরেজিতে অনুদিত বই ‘৬-পয়েন্টস’ এবং প্রকাশনা সংস্থা নালন্দা থেকে প্রকাশিত হয়েছে-মানিক মোহাম্মদের ‘পাকিস্তান পাপাচারের বিষবৃক্ষ’, ও সোহেল মল্লিক সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত ৫০ কিশোর গল্প’ ইত্যাদি।

সারাবাংলা/এমও

Advertisement
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন