রবিবার ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৩১ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘গ্রেনেড হামলায় খালেদার সম্পৃক্ততা অস্বীকার করা যায় না’

আগস্ট ২১, ২০১৯ | ৭:১৯ অপরাহ্ণ

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ২১ শে আগস্টে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় হয়েছিল এটি এখন প্রমাণিত সত্য। তখন খালেদা জিয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। আর বাবর ছিলেন সেই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। সেক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার সম্পৃক্ততা কেউ অস্বীকার করতে পারে না।’

বিজ্ঞাপন

বুধবার (২১ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনিস্টিটিউশন মিলনায়তনে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনাসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সব কথা বলেন। ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত ও আহতদের স্মরণে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদে নৃশংস গ্রেনেড হামলার ঘটনায় তৎকালীন সরকারের জড়িতের বিষয়ে বিভিন্ন যোগসূত্র তুলে ধরেন গ্রেনেড হামলার শিকার শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই হামলাটি ওই সময়ের সরকারের পক্ষ থেকে করা। কেননা এই ঘটনার পরের দিন সিটি করপোরেশনের গাড়ি এনে ওই এলাকাটা ধোয়ামোছা শুরু করে। আমি সঙ্গে সঙ্গে নানককে ফোন করে বলি যে, তোমরা শিগগিরই ব্যবস্থা নাও। সব আলামত মুছে ফেলছে, আলামত যেন রক্ষা হয় তার ব্যবস্থা করো। এরপর ঘটনাস্থলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ছুটে যান, যুবলীগের নেতাকর্মীরা ছুটে যান।’

দলীয় প্রচেষ্টায় আলামত রক্ষা করার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরাই আলামত রক্ষা করার চেষ্টা করি। কিন্তু আলামত রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো তৎপরতা ছিল না। সেখানে এত বড় একটা এক্সিডেন্ট হয়ে গেছে। তার মানে, এই ঘটনার যেন কোনো আলামত না থাকে, সেই চেষ্টাটাই কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের পক্ষ থেকে করা করেছিল। জনমতের চাপে হাইকোর্টের একজন বিচারপতিকে দিয়ে একটা তদন্ত কমিটি করা হয়। সেই তদন্ত কমিটি যে রিপোর্ট দিয়েছিল তা ছিল তাদের ফরমায়েশি রিপোর্ট।’

বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সেখানে একটা সাধারণ মানুষ ধরে নিয়ে এসে তাকে (জজ মিয়া) আসামি করা হয়। সে নাকি এই আক্রমটার ব্যবস্থা করেছিল, সেই নাকি এই ষড়যন্ত্রের হোতা। তখন এই জজ মিয়া নাটক সাজানো হয়। এখন তো আস্তে আস্তে সবই বের হচ্ছে, কীভাবে এই জজ মিয়াকে নিয়ে আসে, কীভাবে তার ওপর টর্চার করে তাকে দিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করে।’

‘জজ মিয়া তো গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ সে এত গ্রেনেড কোথা থেকে কিনবে’ প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গ্রেনেড হামলার আগে ধানমন্ডি-৫ নম্বরে তারেক রহমান শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করলেও কেন ওই বাসা ছেড়ে ক্যান্টনমেন্টে গিয়েছিলেন সে বিষয়ে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেডগুলো কোথা থেকে আসল? এখানে বিএনপি-জামায়াত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এ ধরনের ঘটনা কোনোদিন ঘটানো সম্ভব না। এটি আজকে প্রমাণিত সত্য। মামলা করে এতদিন পরও আমরা একটা রায়ও পেয়েছি। এখন উচ্চ আদালতে একটা ডেথ রেফারেন্স যাবে। আমি আশা করি, এই ঘটনায় সম্পৃক্ত সকলের বিচার হবে। কিন্তু যাদের আমরা হারিয়েছি তাদের তো ফেরত পাব না।’

বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের বহু নিবেদিত প্রাণ নেতাকর্মীর জীবনদানের কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যাই হোক আল্লাহর মাইর বলে দুনিয়ায় একটা কথা আছে। মানুষ বোঝে না, আল্লাহর শক্তি কত। তদন্তের মাধ্যমে গ্রেনেড হামলায় যারা জড়িত সব আসামি শাস্তি পেয়েছে। তবে এখানে ঠিক, খালেদা জিয়াকে আসামি করা হয়নি। কিন্তু তার যে এখানে সহযোগিতা রয়েছে, সে তো প্রধানমন্ত্রী ছিল। তার যে সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব রয়েছে, এটা তো অস্বীকার করা যায় না এবং খালেদা জিয়াই কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিল। আর বাবর কিন্তু স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিল। সেক্ষেত্রে তার সম্পৃক্ততা থাকার কথা কেউ অস্বীকার করতে পারে না।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে তারা হত্যা করেছে। পঙ্গু করেছে। অত্যাচার করেছে। চোখ তুলেছে। পা কেটে দিয়েছে। কত পরিবারকে ধ্বংস করেছে। ঠিক হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী একাত্তরে আমাদের ওপর আক্রমণ করেছে, হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে ঠিক বিএনপি একই কাজ করেছে। এখানে জিয়াউর রহমান শুরু করেছিল। এরশাদও সেই একই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। খালেদা জিয়াও সেই একই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। তাদের একটাই উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগ যেন কখনো ক্ষমতায় আসতে না পারে। তাহলে তারা বাংলাদেশটাকে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বারবার মৃত্যুর সামনাসামনি হয়েছি। বারবার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কিন্তু ঢাল হিসেবে আমাকে রক্ষা করেছে। একবার না, বারবার, অনেক মানুষ জীবন দিয়েছে। মাঝে মাঝে চিন্তা করি, এক একটা ঘটনা। যেদিন থেকে পা দিয়েছি, যেদিন থেকে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া শুরু করেছি, এমন কোন জায়গা নাই যেখানে বাধা না হয়েছে। আর এই বাধা প্রতিহত করতে গিয়ে আমার বহু নেতাকর্মী জীবন দিয়েছে, এটি হলো বাস্তবতা।’

২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট সেদিনের সেই সমাবেশ করার প্রেক্ষাপট তুলে তিনি ধরে বলেন, ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদ জানাতে আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শান্তির মিছিল করতে চেয়েছিলাম, একটা র‌্যালি করতে চেয়েছিলাম। আমরা আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে সাধারণত মিটিং করি। যাতে মিটিংটা ভালোভাবে করতে পারি, তাই মুক্তাঙ্গনটার পারমিশন আমরা চাই কিন্তু সেই পারমিশন আমাদের দেয়নি। রাত্রি সাড়ে এগারটা বারোটার দিকে একটা পারমিশনের চিঠি পাঠানো হয় আওয়ামী লীগ অফিসে। রাত বারোটার সময় কে চিঠিটা খুলবে আর কে দেখবে, আর কে ব্যবস্থা নেবে। এটি ছিল তাদের বলার যে, আমরা তো পারমিশন দিয়েছি।’

 সেদিনের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা থেকে নিজের বেঁচে যাওয়ার কথা তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যেখানে ব্যবস্থা নিয়েছি, সেখানেই করেছি। আল্লাহ বাঁচাবে বলেই বোধহয় নিজেই ব্যবস্থা করেছিল, সেটা আমরা জানি।’

সমাবেশের দিন নিরাপত্তার স্বার্থে আশপাশের ভবন এবং ছাদগুলোতে নিজ দলের স্বেচ্ছাসেবকদের কাউকে কোনো ভবন বা ভবনের ছাদে অবস্থান নিতে দেয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

এক ফটোসাংবাদিকদের ডাকে সাড়া দেওয়ার কারণে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়ার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যখন ছাত্ররাজনীতি করি। তখন তিনি ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে অন্য সাংবাদিকরাও চিৎকার করতে শুরু করল, আমরা ছবি পাইনি। এই ছবি তুলতে গিয়ে কয়েকটা সেকেন্ড দাঁড়ানো। এর মধ্যেই কিন্তু এই গ্রেনেড হামলা শুরু হয়ে গেল। বিশেষ করে হানিফ ভাই, আপনারা দেখেছেন ছবিতে। কীভাবে মানবঢাল রচনা করল আমার আশেপাশে যারা ছিল সবাই মিলে। যখন একটার পর একটা গ্রেনেড বিস্ফোরণ  হচ্ছে। আসলে কি আমরা বুঝতে পেরেছি যে তখন। এটা সেই আর্জেস গ্রেনেড যেটা যুদ্ধ ময়দানে ব্যবহার হয়, সেটা একটা জনসভায় মারবে।’

‘গ্রেনেডের স্প্লিন্টারগুলো এসে হানিফ ভাইয়ের মাথায় গায়ে লাগছে। আর সেখান থেকে রক্ত ঝরে আমার গায়ে পড়ছে। তিনটা গ্রেনেড পড়ার পরে একটু বিরতি। সেই সময় আমার সঙ্গে যারা ছিল ওরা ভাবল আমি বুঝি আহত হয়েছি। আমাকে বলল, আমি জানাই, আমার তো কিছু হয়নি। আমি ঠিক আছি। খালি আমার চশমাটা পড়ে গেছে। আবার একটার পর গ্রেনেড মারতে শুরু করল।’

 ‘এই ধরনের একটা পরিস্থিতি দিনে দুপুরে কীভাবে ঘটতে পারে? সরকারে তখন ছিল তারা। এই বিএনপি আর জামায়াত জোট তখন ক্ষমতায়। জামায়াত আর বিএনপি জোট, তাদের মদদ ছাড়া এটা হতে পারে না। এই ঘটনার পর তাদের তো ধারণা ছিল আমি নাই। আমি মারা গেছি দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যখন এটা থামল, আমরা নিচে নেমে যখন গাড়িতে উঠতে যাব, ঠিক সেই সময় আবার গুলি করা হলো, সেখানে মাহবুব ছিল তার গায়ে গুলিটা লাগল।’

এর আগে সকাল নয়টার দিকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে স্থায়ী বেদীতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। আওয়ামী লীগের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর একে একে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন স্থায়ী বেদীতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এ সময় বক্তারা এই ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও জড়িত বলে দাবি করেন। পাশাপাশি লন্ডন থেকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকর করার দাবি করেন। তা না হলে ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের আত্মা ও আহতদের কষ্ট লাঘব হবে না বলে। তাই আগামী দিনে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পলাতক আসামিদের সাজা কার্যকর করার দাবি জানান।

আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় সূচনা বক্তব্য রাখেন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এরপর ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের প্রতি সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, সভাপতিমণ্ডলির সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য ও তৎকালীন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য এসএম কামাল হোসেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের সভাপতি আবুল হাসনাত এবং উত্তরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান।

আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে যৌথভাবে সভা পরিচালনা করেন উপ প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।

সারাবাংলা/এনআর/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন