রবিবার ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১০ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

দ্য লাস্ট প্যারাডাইজ অন আর্থ।। ৮ম পর্ব: অন্ধকারে ভূতের ভয়ে!

নভেম্বর ৩০, ২০১৯ | ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ

সন্ধ্যার পরে বাচ্চাদেরকে সাইকেল দিয়ে আমরা পায়ে হেঁটে চললাম দ্বীপটাকে ঘুরে দেখতে। দুপুরে হোটেলে খেয়ে পকেট কিছুটা হালকা হয়ে গেছে, তাই ডিনার বাইরে করার প্ল্যান নিয়ে গিলি হারবারের দিকে চললাম।

বিজ্ঞাপন

শুনেছি, গিলিতে খাবার খুব সস্তা। নাইট মার্কেটে নাকি পানির দামে খাবার মিলে। তাই নাইট মার্কেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। পথে এক ইন্ডিয়ান স্কুবা ডাইভার আমাদের এমন এক রেস্টুরেন্টের নাম সাজেস্ট করলো, সেটা খুঁজতে খুঁজতে নাইট মার্কেট পার হয়ে অনেক দূর চলে আসলাম। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সেই রেস্টুরেন্টে পৌঁছে দেখি টেবিল ফাঁকা নেই। তার উপর খাবারের দাম শুনে চোখ কপালে উঠল। তবে সুস্বাদু খাবারের কথা ভেবে আরও একবার পকেট হালকা হওয়াকে মেনে নিলাম।

অন্ধকারে ভূতের ভয়ে!

টেবিল পাওয়ার জন্য নাম লিখিয়ে আধঘন্টা অপেক্ষা করে আর ধৈর্য রাখতে না পেরে অন্য রেস্টুরেন্ট খুঁজতে গেলাম। তবে কোথাও তেমন পানির দরে খাবার পেলাম না। সি ফুডের দাম রীতিমতো আকাশছোঁয়া। অগত্যা আকাশছোঁয়া দামের খাবার নিয়ে পানি দিয়ে গলাধকরণ করে হোটেলের দিকে হাঁটা ধরলাম।

বিজ্ঞাপন

ধারণা করেছিলাম, ১৫ বর্গ কিলোমিটারের প্রায় ডিম্বাকৃতির দ্বীপটা আর কত বড় হবে? যেখান থেকে শুরু করেছি তাতে দ্বীপের প্রায় অর্ধেকের বেশি চলে এসেছি। এখন সোজা পথে গেলে দ্রুত হোটেলে পৌঁছতে পারবো। তাই আমরা যে পথে হারবারে গিয়েছিলাম, সে পথে না গিয়ে সামনের দিকে হাঁটা ধরলাম।

বলাই বাহুল্য-আমাদের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল এটি। বরং যে পথ ধরে এসেছি সে পথ ধরে গেলে আরও তাড়াতাড়ি পৌঁছতে পারতাম।

ভূতুড়ে রাস্তা
কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম অন্ধকার আরও কালো আর ঘন হচ্ছে। রাস্তায় কোন আলোর ব্যবস্থা নেই। রাস্তার দু'পাশে ঝোপ আকৃতির গাছ অন্ধকারে একটা ভৌতিক অবয়বের মতো দাঁড়িয়ে আছে। চলার শুরুর দিকে কিছুদূর পর্যন্ত দু'একটা গাছে টিমটিমে আলোর কিছু বাতি লাগানো দেখলাম।

মাটির খুব কাছাকাছি থেকে উঠে আসা গাছের কাণ্ড অনেকগুলো হাত-পা মেলে যেন ঝোপ হয়ে আছে। রাস্তায় হাঁটার উপায় নেই। কোথাও বালি, কোথাও উঁচু নিচু খানাখন্দ। তার উপর আমাদের অনেকের পায়ে স্নিকার নেই। কারো পায়ে দুই ফিতার স্যান্ডেল তো কারো বেল্ট ছাড়া নৌকার ছইয়ের মতো স্যান্ডেল! তাই হাঁটতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল এবড়োথেবড়ো পথে। বাচ্চাদের সাইকেল ক্ষণে ক্ষণে বালিতে দেবে যাচ্ছে। নেমে যেয়ে আবার সাইকেল টেনে উঠাতে হচ্ছে!

উফ! সে কি একটা রাত ছিল। চারপাশে কেমন গা ছমছমে পরিবেশ। জনমানবহীন নির্জন দ্বীপ! সুনসান রাস্তা। আন্ডা-বাচ্চা আর তাদের মায়েদের ভয় কাটানোর জন্য দুই বাবা মিলে ‘মাফিয়া’ গ্যাং এর গল্প ফাঁদলো। তাতে লাভ তো হলোই না! ভূতের ভয়ের সাথে যোগ হলো মাফিয়াদের ভয়। মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে রাস্তা চলছি। কিছু দূর পরপর দু'একটা নামীদামী হোটেল চোখে পড়ে। সেই সঙ্গে হোটেলের সামনে কিছু আলো। আমরা আশায় বুক বাঁধি- ওটাই বুঝি আমাদের হোটেল! কিন্তু না! গিলির নামী হোটেলগুলো সব প্রায় একই ধরনের প্যাটার্ণে তৈরি করা। অন্তত আমার কাছে সেদিন রাতের বেলা তাই মনে হয়েছে। কাছ থেকে না দেখলে পার্থক্য ধরা মুশকিল।

আমার ভূতে বিশ্বাস নেই কিন্তু অন্ধকার ভীষণ ভয় পাই। গ্রুপের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে একসময় রচনা আর আমি খুব পেছনে পড়ে গেলাম। অন্ধকারে কিছুদূর এগোতে দেখি দুটো ছোট বড় ছায়ামূর্তি নি:শব্দে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাও আবার ফ্যাকাশে সাদা পোশাকে।

আমি আকাশপাতাল বিদীর্ণ করে চিৎকার দিতে যেয়ে কি মনে করে যেন দম আটকে রাখলাম। ঐ জায়গাটুকু দ্রুত পার হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। মুখ দিয়ে আওয়াজ করে রচনাকে কিছু বলবো সেই সাহসও আমার হচ্ছিল না। দ্রুত পায়ে হেঁটে ফ্যাকাশে ভূত দুটো আর রচনাকে পেছনে ফেলে কয়েক কদম এগিয়ে যেতেই রচনা বলে উঠলো- ‘দাঁড়াও! তোমার পতি আর পুত্রকে নিবে না!' আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাদের দেখতেও ভয় পাচ্ছিলাম। সন্দেহ হচ্ছিল-সত্যিই কি ওরা?

পতি বলে উঠলো, ‘তোমাদের দেরি দেখে দাঁড়ালাম।’ এবার বিশ্বাস হলো। বড় করে একটা শ্বাস নিলাম। স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলে আবার এগোতে লাগলাম। প্রায় ঘন্টা দেড়েক হাঁটার পর অবশেষে হোটেল পেলাম। এতো টায়ার্ড জীবনেও হইনি। মনে হচ্ছিলো এই বোকামীর কোন মানেই হয়না। সবই আমাদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে। দ্বীপ দেখার জন্য রাতের সময়কে বেছে নেওয়া, সাইকেল নিয়ে এবং পায়ে হেঁটে হারবার এলাকায় যাওয়া, সবই ছিল আমাদের বোকামী। দিনের আলোতে একটা ঘোড়ার গাড়িতে করে পুরো দ্বীপটা চক্কর মারতে পারলে চোখ-মন-শরীর সবই জুড়তো! আমাদের মতো আপনারা কেউ যেন এই ভুল ভুলেও না করেন সেটি খেয়াল রাখবেন।

দ্য লাস্ট প্যারাডাইজ অন আর্থ।। ৭ম পর্ব: মনোমুগ্ধকর গিলি

পরদিন গিলি থেকে সকাল ১১ টায় বোটে উঠে দুপুর ১ টায় আবার পাদাং হারবারে এসে নামলাম। ট্যুর গাইড আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আমাদের আজকের ডেস্টিনেশন-ওলুওয়াতু টেম্পল ও পাদাং পাদাং বিচ।

অন্ধকারে ভূতের ভয়ে!

পাদাং পাদাং হারবার

আমরা আগেই লাঞ্চ সেরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, তাই আমাদের নির্দিষ্ট গন্তব্য পথের রেস্টুরেন্ট খুঁজতে লাগলাম। ম্যাকডোনাল্ডস পেয়ে সেখানেই লান্চ সারলাম।

এখানে খাবারের ব্যাপারে ধারণা দেওয়ার জন্য একটু বলি। বালি ট্যুরে আমরা সকালের নাস্তা করেছি হোটেলে। দুপুরের খাবার বেশিরভাগ সময় ম্যাগডোনাল্ডসে এবং রাতের ডিনার সেরেছি জিম্বারান বিচ এলাকার কোন রেস্টুরেন্টে সি ফুড খেয়ে। দু' একবেলা একটু উনিশ-বিশ হয়েছে, তবে মোটামুটি এই নিয়মেই আমাদের খাবার খাওয়া হতো। যেহেতু বাচ্চারা ফাস্টফুড পছন্দ করে তাই দুপুরবেলা আমরা ফাস্টফুড খেয়েছি যাতে অন্য দু'বেলা এরা ‘খাবো না' 'খাবো না' বলে ঘ্যানঘ্যান করতে না পারে! আর ইন্দোনেশিয়ায় ফাস্টফুড খুবই সস্তা। আমাদের দেশের কেএফসির তুলনায় ম্যাকডোনাল্ডস তো ওখানে পানির দামে মিলবে। তাই দুপুরে ম্যাকডোনাল্ডস দেখা মাত্রই আমরা হুড়মুড় করে ঢুকে যেতাম।

যাই হোক, আমাদের প্রথম গন্তব্য এবার পাদাং পাদাং বিচ। যেহেতু গিলি থেকে আসতে আসতে দিনের অর্ধেকটা চলে গেছে। তাই দুটো কাছাকাছি দূরত্বের স্পটে বেড়ানোর সিদ্ধান্ত ভালো বলে মনে হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন