বিজ্ঞাপন

হিসাবে কি শুভঙ্করের ফাকিঁ?— প্রশ্ন আপিল বিভাগের

February 26, 2020 | 12:25 am

আব্দুল জাব্বার খান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেডের (আইএলএফসিএল) টাকার হিসাব নিয়ে গরমিল আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আপিল বিভাগ।

বিজ্ঞাপন

আর্থিক খাতের এই প্রতিষ্ঠানের ১৫৯৫ কোটি টাকার হদিস নেই বলে আপিল বিভাগকে জানানো হয়। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বরাত দিয়ে এসময় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন প্রশ্ন করেন— ‘আমরা দেখলাম একজনই সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। আপনাদের হিসাব কি শুভঙ্করের ফাঁকি?’

মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেড সংক্রান্ত মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আদালতের নির্দেশে ওই কোম্পানিতে নিযুক্ত চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহিম খালেদ এবং বাংলাদেশের ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলম এদিন আদালতে প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন- ১৫৯৬ কোটি টাকার হদিস মিলছে না, আপিলে ইব্রাহিম খালেদ

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী তানজিব-উল আলম। অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আহসানুল করিম। শুনানি শেষে আদালত আগামী বুধবার আদেশের জন্য দিন ঠিক করে দেন।

মঙ্গলবার সকালে শুনানিতে খন্দকার ইব্রাহীম খালেদ আদালতকে বলেন, ২০১৫ সাল পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ভালোমতো চলছিল। ২০১৬ সাল থেকে এর অবস্থা খারাপ হতে থাকে। এর পেছনে ‘কি পারসন’ (মুখ্য ব্যক্তি) হিসেবে কাজ করেছেন প্রশান্ত কুমার হালদার। তার সঙ্গে ছিলেন আরও অনেকেই। তারা একসঙ্গে অনেক শেয়ার কিনে কোম্পানির আগের নেতৃত্বকে বের করে দেন। এর মধ্যে কাউকে চাকরিচ্যুত করা হয়, কাউকে অবসরে যেতে বাধ্য করা হয়, কাউকে ছাটাই করা হয়।

খন্দকার ইব্রাহীম খালেদ আরও বলেন, পিকে হালদারসহ কিছু ব্যক্তি এই কোম্পানি থেকে ১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে তা লেখা আছ। তবে তলিয়ে দেখতে অনুমতি দেওয়া হয়নি। সবশেষ কোন ব্যক্তি পর্যন্ত এই টাকা পৌঁছেছে, তা জানা নেই। এই টাকা ফেরত আসার সম্ভাবনা নেই। এই টাকার হদিসই পাওয়া যাচ্ছে না (আনট্রেসেবল)।

তবে রিকভারি এজেন্ট দিয়ে এই টাকা উদ্ধার করা যেতে পারে বলে মত দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এই ডেপুটি গভর্নর। এ ধরনের এজেন্টের সঙ্গে তার কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এর আগে আর্থিক খাতের আরেক আলোচিত প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিংয়ের অবসায়ন করা হয়। এরপর ইন্টারন্যাশনাল লিজিংকেও অবসায়ন করা হলে আর্থিক খাতে ধ্বস নামতে পারে বলেও আপিল বিভাগের কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করেন খন্দকার ইব্রাহীম খালেদ।

তবে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংকে ফের দাঁড় করানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে নিজে সন্দিহান বলে আদালতের সামনে মন্তব্য করেন আদালতের নির্দেশে এই কোম্পানিতে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসা ইব্রাহীম খালেদ। তিনি বলেন, আমি সাহস পাচ্ছি না। আমি তো এই কোম্পানির কোনো শেয়ারহোল্ডার নই। হাইকোর্টের আদেশে আমাকে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান করা হয়েছে। বাইরে থেকে এসে আমি একে কতটা দাঁড় করাতে পারব? শর্ষের মাঝে ভূত থাকলে আমি কী করতে পারি!

এ সময় প্রধান বিচারপতি কোম্পানিটির আমানতকারীদের অবস্থা জানতে চাইলে ইব্রাহীম খালেদ বলেন, টাকা তো নেই। তারা চাইলেও টাকা ফেরত দেওয়া যাচ্ছে না। পয়সা তো নেই।

এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলম আদালতকে বলেন, এই কোম্পানিটির মূলধনে ৪৫০ কোটি ১৯ লাখ টাকা ঘাটতি রয়েছে। ব্যাংক ঋণ আছে ৯৫৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা। সর্বমোট ঋণ ৩ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক কী পদক্ষেপ নিয়েছে— প্রধান বিচারপতি তা জানতে চাইলে এ কর্মকর্তা বলেন, আমারা বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা দিয়েছি। কখনো সেগুলো বাস্তবায়ন করেছে, কখনো করেনি।

মো. শাহ আলম বলেন, নিয়ম বহির্ভূতভাবে টাকা নিয়ে যাওয়ায় মূলধনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে। এরই মধ্যে একটি প্রতিবেদন জমাও দিয়েছে। মোট ৪৮টি ঋণ হিসাবের সঙ্গে ১২টি প্রতিষ্ঠান ও কিছু ব্যক্তির বিপরীতে মোট ১৫৯৬ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। ঋণ বিতরণে পরিচালক পর্ষদের ডিউ ডিলিজেন্সের ঘাটতি ছিল। এই ৪৮টি ঋণ হিসাবের লেনদেন ভাউচার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। সুবিধাভোগী কারা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এসময় প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা দেখলাম একজনই সাড়ে ৩ হাজার কোটি কাটা নিয়েছে। আপনাদের হিসাব কি শুভঙ্করের ফাঁকি? এর জবাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলম বলেন, পি কে হালদারসহ অন্যান্যরা এই কোম্পানি থেকেই সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে আমরা পাইনি।

বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে— আদালত জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা তাদের ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করেছি, শোকজ করেছি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ব্যবস্থা নিতে বলেছি।

এরপর ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেড নিয়ে বাংরাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন তুলে ধরেন আইনজীবী তানজীব-উল আলম। তাতে বলা হয়, যারা শেয়ার নিয়ে কোম্পানিটি দখল করেছে, তারা ডাকাতির জন্যই এসেছিল। বিআর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, ন্যাচার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, নিউটেক এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড ও হাল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড একই সময়ে ২০১৫ সালের ১১ মার্চ একই পরিমাণ মূলধন ২০ লাখ টাকা নিয়ে ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। পরে পরিচালনা পর্ষদে এই চার প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। পরের তিন বছরে আগ্রাসী ঋণ বিতরণের মাধ্যমে এক কোটি টাকার বেশি ১৩৩টি ঋণের নামে ২ হাজার ১০৮ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়। এই ঋণের অর্থ ৭৮১টি চেকের মাধ্যমে দু’টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ৪১টি ব্যাংক ও কিছু ব্রোকারেজ হাউজে স্থানান্তর করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংকের চেক ব্যবহার করে ঋণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়— এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধোভোগীদের আড়ালও করা হয়।

এই অনিয়মের জন্য কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ, প্রধান নির্বাহী, নির্বাহী কমিটি, নিরীক্ষা কমিটি, ঋণ-ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ, আভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা পরিপালন বিভাগ সম্মিলিতভাবে দায়ী বলে জানান আইনজীবী তানজীব।

শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, কিছু লোক কিছু লেখাপড়া শেখে জনগণের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য। এরা হোয়াইট কলার ক্রিমিনাল। এদের কাজই হচ্ছে জনগণের টাকা হাতিয়ে নেওয়া। পিকে হালদার কিভাবে চলে গেল, সেটা আপনাদের (আদালতের) দেখা উচিত। কোম্পানি চলবে কি চলবে না, সে বিষয়ে আপনারা সিদ্ধান্ত নেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, আগে তো ব্যাংক ছিল না। মানুষ গোলায় ধান রাখত। এটাই ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু মানুষ এখন ব্যাংকে টাকা রাখে। এখন অনেকেই ব্যাংক করেন জনগণের টাকা লুটের জন্য। কোর্ট কি চোখ বন্ধ করে থাকবে? দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছেন। কোর্টের আদেশ যদি স্থগিত করা হয়, তাহলে যারা কোম্পানিটিকে ডুবিয়েছে, তারাই লাভবান হবে। হাইকোর্ট যে আদেশ দিয়েছেন, এর চেয়ে ভালো আদেশ হতে পারে না।

হাইকোর্টর আদেশ স্থগিত চেয়ে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেডের আবেদনকারী দুই কর্মকর্তার আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, এখানে (শুনানিতে) কোম্পানি অবসায়নের কথা এসেছে। কোম্পানি যদি ভেঙে যায়, তাহলে কিছু থাকবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকও বলেছে কোম্পানি পুনর্গঠনের কথা। অবসায়ন হয়ে গেলে আর ব্যবসা থাকবে না। অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও চাচ্ছে যেকোনোভাবে কোম্পানিটকে বাঁচাতে হবে।

এ আইনজীবী আরও বলেন, আমার মক্কেলরা ভালো মানুষ। বাংলাদেশ ব্যাংকও বলেছে, কিছু ভালো পরিচালক আছেন। ভালো মানুষ স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে টিকতে পারবে না। পিকে হালদারে যেকোনো শাস্তিতে আমাদের আপত্তি নেই। পিকে হালদারসহ যারা জড়িত ছিল, সবার শাস্তি আমিও চাই। কিন্তু তাদের জন্য আমাদের মরতে হয়, তাহলে ব্যাংকিং খাত ধ্বংস হয়ে যাবে। মাঝামাঝি কোনো পথ নেই— হয় কোম্পানিকে অবসায়ন করতে হবে, নয় কোম্পানিকে জীবিত রাখতে হবে।

এর আগে, গত ২১ জানুয়ারি প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিস লিমিটেডের পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদারসহ (পিকে হালদার) ২০ জনের সব সম্পদ ক্রোক, ব্যাংক হিসাব ও পাসপোর্ট জব্দের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এই ২০ জনের সম্পদের হিসাব ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে দাখিলেরও নির্দেশ দেন আদালত।

সারাবাংলা/এজেডকে/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন