বুধবার ২২ মে, ২০১৯ ইং , ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ রমজান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

বন্ড দিয়ে জেলে গেছেন ফাতেমা! দুই সন্তান জানে না মা কোথায়

এপ্রিল ১৭, ২০১৯ | ৮:৫৩ অপরাহ্ণ

জান্নাতুল ফেরদৌসী, বার্তা সম্পাদক

ঢাকা: দেশের সমুদ্র উপকূলীয় জেলা ভোলার অজপাড়া-গাঁয়ের মেয়ে ফাতেমা। বয়স ত্রিশ। দুই সন্তানের এক বিধবা মা। স্ট্রোক হয়ে স্বামী যখন মারা যান তখন মাত্র বাইশ বছর বয়স তার। সেসময় বাড়িতে মায়ের কাছে ছোট ছোট দুটি সন্তানকে রেখে কাজের খোঁজে ঢাকায় আসেন। এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে তার কাজ জুটে যায় রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের একটি বাড়িতে। বাড়িটির নাম ফিরোজা।

সেই ফিরোজায় ফাতেমার কাজ ছিল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দেখভাল করা।

সেই শুরু। এরপর ভাগ্যের ও সময়ের পরিক্রমায় খালেদা জিয়ার এখন ঠাঁই হয়েছে রাজধানীর পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডে একটি বিশেষ জেলখানায়। সেখানে তার সঙ্গে একই জেল কুঠুরিতে ঠাঁই হয়েছে ফাতেমারও। সে ছিলো এক স্বেচ্ছা কারাবরণ।

বিজ্ঞাপন

খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার দিনটি (২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে সে খবর সকলেরই জানা। সম্প্রতি খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেও তার কেবিনে সঙ্গী হয়েছেন ফাতেমা। হাসপাতালের ৬২১ নম্বর কক্ষটিও কারাগারের অংশ। বলা চলে, এই ফাতেমা-ই এখন খালেদা জিয়ার জেল জীবনের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। জেল কোডের বিশেষ আইন মেনেই তাকে রাখা হয়েছে কারাগারে। আর সে কেবল যে খালেদা জিয়ার ইচ্ছায়, তা নয়। এরই মধ্যে খবর হয়েছে, ফাতেমা নিজেই চেয়েছেন প্রায় এক দশক ধরে যাকে সেবা দিয়ে আসছেন জেলখানাতেও তার সঙ্গে থাকবেন।

কিন্তু এদিকে ঘটে যাচ্ছে অনেক ঘটনা। ফাতেমার দুই সন্তান, যারা এখন তাদের কৈশরে পড়েছে, তারা জানে না তাদের মা এখন কারাগারে। দুই সন্তানের মধ্যে বড়টি মেয়ে। বয়স ১৪। ভোলার একটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। ছোটটি ছেলে। বয়স ১০। পড়ে চতুর্থ শ্রেণিতে।

সারাবাংলাকে এসব কথা জানালেন ফাতেমার বাবা রবিজুল ইসলাম।

সম্প্রতি খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে  নেওয়া হলে সেখানে তার সঙ্গী হন ফাতেমা

রাজধানীর সিপাহীবাগে একটি জরাজীর্ণ মুদিখানায় বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সারাবাংলার কাছে তুলে ধরলেন ফাতেমার এইটুকু জীবনের আদ্যপান্ত।

মাসে দুই হাজার টাকা মজুরি নিয়ে খালেদা জিয়ার বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ শুরু করেন ফাতেমা। এখন তার মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার টাকা।

এই টাকায় চলে দুই সন্তানের লেখাপড়া, ভরণ-পোষণ। কিন্তু তাতে এখন আর দিন চলে না ফাতেমার পরিবারের। যে চাপ গিয়ে পড়েছে বাবা রবিজুলের উপর।

সত্তরোর্ধ্ব এই রবিজুল জানালেন, তার ঝুপড়ি মুদিখানাটি ফাতেমাই ঋণ করে বসিয়ে দিয়েছিলেন তাকে। সংসারের টানা-পোড়েনে যার পুঁজি শেষ হতে হতে এখন প্রায় শূন্য। শিগগিরই দোকানটি তুলে দিতে যাচ্ছেন রবিজুল।

কথা পাড়তেই এই বৃদ্ধ বলেন, ‘আমার চৌদ্দ পুরুষের কেউ রাজনীতি করে নাই। অথচ আজ রাজনীতির ফান্দে পইড়া মাইয়াডা নিরপরাধী হইয়াও জেল খাটে।’

ফাতেমা জেল থেকে বের হয়ে এলে পরিবারটা বাঁচতে পারে, এমন আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ওরে বাইর করতে পারলে খুব সুবিধা হয়। পোলাপান দুইডা বড় হইতেছে। দোকানটার পুঁজি ভাইঙ্গা খাইছি এতোদিন। দিনকে দিন খরচ বাড়তি। চোখে এখন আন্ধার দেখি।’

‘ওরাতে জানেই না ওগো মা জেলে,’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন এই বৃদ্ধ।

ফাতেমা কি জেল থেকে বের হতে চান? এই প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে রবিজুল বলেন, ‘গত মাসে জেলখানায় দেখা করতে গেছিলাম। কইল বন্ড সই দিয়া ম্যাডামের লগে আইছি। কেমনে ছাড়া পামু?’

তবে ফাতেমার সঙ্গে বাবা রবিজুলের দেখা হয় না বললেই চলে। তিনি বলেন, ‘সেই যে কাজে ঢুকল, তার পর থেকে তো মেয়েটারে দেখতেই পাই না।’

গুলশানে যে বাড়িতে ফাতেমা থাকতেন সেখানে প্রতিমাসে টাকা নিতে যাওয়ার দিন একবার দেখা হতো বলে জানান তিনি।

ফাতেমা জেলে যাওয়ার পর তাদের দেখা হয়েছে মাত্র দুইবার। তার মধ্যে একবার যখন প্রথম হাসপাতালে নেওয়া হয় খালেদা জিয়াকে তখন এক চিকিৎসকের সহযোগিতায় দেখা করতে পেরেছিলেন। তবে কোনও কথা বলার সুযোগ হয়নি। এরপর গত ২০ মার্চ নাজিমুদ্দিন রোডের জেলখানায় ফাতেমার সঙ্গে একবার দেখা করার সুযোগ পান রবিজুল। সেদিন তাদের ঘণ্টাখানেক কথা হয়।

‘কথা আর কি কমু? মাইয়ারে এতোদিন পর দেইখ্যা খালি কান্দন (কান্না) আইতাছিল,’ বলেন রবিজুল।

তিনি বলেন, ‘পরে ওরে কইলাম, অনেক ধার দেনা জমছে। সেগুলা নিয়ে ম্যাডামের সাথে কথা ক’। ফাতেমায় কইল, হের লগে কথা কইয়া লাভ নাই। তুমি বিএনপির বড় স্যারগো লগে দেখা করো, কথা কও। ট্যাকা চাও।’

রবিজুল জানান, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের সঙ্গেই তাকে দেখা করার পরামর্শ দেন ফাতেমা।

ফাতেমার ছেলে মেয়েরা কার কাছে আছে? কেমন আছে? জানতে চাইলে রবিজুল বলেন, ‘মাইয়াডা ক্লাস সেভেনে আর পোলাডা ফোরে পড়ে। সেই গ্যান্দা বয়সে নানীর কাছি রাইখ্যা আইছে। নানীই ওগো সব। মা’র কথা তেমন একটা কয় না। ওরা জানে মা ঢাকায় চাকরি করে, মাস শেষে ট্যাকা পাঠায়। ওগো মা যে জেলখানায় সেইডা এখনও ওরা জানেনা।’

রবিজুল তার অন্ধকার জরাজীর্ণ মুদি দোকানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পণ্যের ওপর জমে থাকা ধূলা ঝাড়তে ঝাড়তে আনমনে বলতে থাকেন, ‘আমি তো বুইড়্যা হইয়া গেছি। গায়ে আর আগের মতন বল নাই। মাটি কাইট্যা বা কামলা দিয়া খামু তারও উপায় নাই। বাড়িতে ফেরারও পথ নাই। ধার দেনা অনেক জমছে। নিজের পোলা নাই। নদী ভাঙনে সব শ্যাষ। চার চারটা মাইয়্যা। এখনও বাকি তিন মাইয়ার জামাইরা নানা অছিলায় ট্যাকা চায়।’

মেয়েদের মধ্যে ফাতেমাই তার অন্যতম ভরসার ছিলেন জানিয়ে রবিজুল বলেন, ‘আমার আর ভরসার দরকার নাই, এখন শুধু চাই ফাতেমা তার পোলা মাইয়া লইল্যা ভাল থাকুক।’

তিনি বলেন, ‘সেই ছোটকালে মাইয়াডারে বিয়া দিছিলাম। হুট কইরা স্বামীটা মরে গেল। এখন পোলা-মাইয়া বড় হইছে। বুঝতে শিখছে। ও ছেলে সন্তান লইয়া একসাথে থাকুক। ওর টা ওই বুঝুক।’

‘মাইয়্যাডা জেলে থাইক্যাও কয় –আব্বা আমি ভালো আছি। আমারে নিয়া চিন্তা কইরোনা। আমার পোলা-মাইয়া দুইটারে খালি লেখাপড়া শিখাও,’ বলেন রবিজুল।

ফাতেমাকে জেল থেকে বের করার কোনও চেষ্টা করছেন কী? সারাবাংলার এমন প্রশ্নে রবিজুল বলেন, ‘ফাতেমা না চাইলে, না কইলে আমি ক্যামনে ওরে জেল থাইক্যা বাইর করি কন দেহি?’

‘রুজি রোজগার নাই। ওর মাইয়া পোলার দায়িত্ব ঘাড়ে। রাইতে চিন্তায় ঘুম আসেনা,’ বলে কিছুটা সময় চুপ করে উদাস তাকিয়ে থাকেন রবিজুল।

রাজধানীর সিপাহীবাগে রবিজুল ইসলামের মুদিখানা

একজন ক্রেতা এলেন টুকিটাকি কিছু জিনিস কিনতে। রবিজুল তার চোখের কোণে জমে যাওয়া পানি হাতে ধরা গামছায় মুছে ফেলেন। ক্রেতাটি চলে গেলে বলেন, ‘মির্জা আব্বাস স্যারের শাহজাহানপুরের বাসায় তার লগে দেখা করমু ভাবতেছি। একটা সমাধান যদি উনারা বাইর করেন।’

গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। রাজধানীর বকশীবাজারের আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতে সাজা ঘোষণার পরই তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। একই সময় ফাতেমাও খালেদা জিয়ার সঙ্গে কারাগারে যান।

প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছরের সাজা হলেও রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই মামলায় খালেদা জিয়ার খালাসের আবেদন খারিজ করে সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করেন হাইকোর্ট।

অনেকেরই প্রশ্ন ফাতেমাও কি এই দশবছর কারাগারে থাকবেন? নাকি বাবার ইচ্ছায় নিজের দুই সন্তানের জন্য কারাগার থেকে বের হয়ে আসবেন?

সে প্রশ্নের উত্তর একমাত্র ফাতেমারই জানা।

সারাবাংলা/জেডএফ/এমএম

আরও পড়ুন

খালেদা জিয়ার সঙ্গে থাকতে পারবেন ফাতেমা
আলোচনায় ফাতেমা!

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন