মঙ্গলবার ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

দ্য লাস্ট প্যারাডাইজ অন আর্থ।। ৫ম পর্ব: সাতরিয়া সুইং দেখা

নভেম্বর ৯, ২০১৯ | ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ

কফি প্লান্টেশন থেকে মাউন্ট বাতুর পর্যন্ত পথের দুপাশে সারি সারি কমলার বাগান। কমলা গাছ ৬-৭ ফুট উঁচু গুল্ম ধরনের উদ্ভিদ। গাছে অসংখ্য পাকা কমলা ঝুলে আছে। ইচ্ছে হলো কমলার বাগানে নেমে কাছ থেকে কমলা ছুঁয়ে দেখি। মাউন্ট বাতুর থেকে ফেরার পথে ইচ্ছে পূরণ হলো। তবে কমলা খেয়ে মজা পাইনি। কেমন পানসে স্বাদ। মিষ্টি নয় একদমই।

বিজ্ঞাপন

মাউন্ট বাতুর থেকে বের হয়ে চললাম তানাহ লট টেম্পল ও ওবুদ রাইস ট্যারেস দেখতে। তানাহ লট টেম্পলের কাছাকাছি এসে প্রচণ্ড ট্রাফিকে বসে রইলাম ঘন্টাখানেক। আমাদের গাড়ির পর্যটকরা বিরক্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ভ্রমণে আমার কখনও ঘুম হয়না। আমি শুধু তাকিয়ে চারপাশটা দেখছি। রাস্তার পাশের দোকানগুলোতে রকমারি জিনিসের পসরা দেখে আমাদের কক্সবাজারের কথা মনে হলো।

দ্য লাস্ট প্যারাডাইজ অন আর্থ।।৪র্থ পর্ব: মাউন্ট বাতুর আগ্নেয়গিরি

আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকদের আচার-আচরণ ও পোশাক দেখছি! বালিতে প্রায় ৮০ ভাগ অস্ট্রেলিয়ান পর্যটক। বাকিরা ইউরোপিয়ান ও অন্যান্য দেশের। তাই পোশাক নিয়ে এদের কোন মাথাব্যথা নেই। ছোট একটি ব্যাকপ্যাক নিয়ে অনায়সেই দূর দূরান্তে ঘুরে আসা যায়। পর্যটকদের বয়সও খুব বেশি না। বেশিরভাগই তরুণ ও যুবক বয়সের। ভৌগলিক সীমারেখায় বালি থেকে অস্ট্রেলিয়ার দূরত্ব খুব কম। এজন্যই হয়তো এখানে অস্ট্রেলিয়ান পর্যটকদের সংখ্যা অনেক বেশি।

বিজ্ঞাপন

দুপুর গড়িয়ে বিকেল তখন। অন্য জায়গা (স্পট) দেখা হবে না ভেবে ট্যুর গাইড গাড়ি ঘোরানোর নির্দেশ দিলেন। গন্তব্য এবার রাইস ট্যারেস। সময় পেলে তানাহ লট টেম্পলে আবার নিয়ে আসা হবে এই বলে গাইড আমাদের রাইস ট্যারেসের দিকে রওনা হলেন। কিন্তু আমাদের সময় হয়নি ! দেখাও হয়নি সমুদ্রের বুক চিড়ে উঠা পাহাড়ের বুকে গড়ে উঠা একটি প্রাচীন মন্দির। দেখা হলো না রাইস ট্যারেসও। গাড়ির চালক জ্যাম এড়ানোর জন্য শহুরে এলাকা ছেড়ে গ্রামের নির্জন এলাকা বেছে নিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ গোল গোল ঘুরিয়ে রাস্তা না পেয়ে ‘স্যরি’ বলে নিয়ে গেলেন আমাদের সাতরিয়া সুইং এ। আমরা মুখ ভার করে গাড়িতে বসে রইলাম।

সাতরিয়া সুইং:

তানাহ লট টেম্পল ও রাইস ট্যারেস দেখাতে না পেরে গাইড আমাদের নিয়ে আসলেন ‘সাতরিয়া সুইংয়ে’। এটি আমাদের প্যাকেজে ছিল না।

আমরা কফি প্ল্যান্টেশনের ভেতর দিয়ে ঢুকলাম সাতরিয়া সুইং এ। ট্যুর গাইড এই জায়গাটির খুব প্রশংসা করছিল। কফি প্রজেক্ট থেকে সিঁড়ির ধাপ বেয়ে পাহাড়ের উপর এই সুইং। পাহাড়ের কিনার ঘেঁষে ইট বিছানো রাস্তা ধরে পায়ে হেঁটে অল্প কিছুদূর যেতে হয়। পাহাড়ের ঢালে নারকেল গাছের সারি। কোথাও এলোমেলো নারকেল গাছ। মাঝখানে কাঠ দিয়ে পাটাতনের মতো ঝুলন্ত মাচা তৈরি করা হয়েছে যাকে ওয়াচ টাওয়ার বলা যেতে পারে। খড়কুটো দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পাখির বাসা। অপরপাশে আরেক জংলা পাহাড়। চারপাশে সবুজাভ প্রকৃতি।

দুই নারকেল গাছের সাথে শক্ত নাইলনের দড়ি বেঁধে তৈরি করা হয়েছে সুইং বা দোলনা। দোলনায় চড়তে যেমন লাখ টাকা গুনতে হয় তেমনি পাখির বাসায় উঠে ছবি তুলতেও গুনতে হয় বিশাল অংকের টাকা।

বালির বেশ কয়েকটি স্থানে এরকম পাহাড়ের ঢালে সুইং নির্মাণ করা হয়েছে পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য। পুরো বালিতে যেহেতু একটি মাত্র সুইং স্পট না তাই তেমন একটা ভিড় চোখে পড়ল না। সাতরিয়া সুইংয়ের দোলনায় চড়তে গেলে পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ওরা পেছনে একটি কাপড় বেঁধে দেয়।

সাতরিয়া সুইংয়ের চারপাশে চোখ বুলিয়ে যা দেখলাম তা সুন্দর তো অবশ্যই। তবে এই পাহাড়ি জায়গাটায় মানুষের আনাগোনা বাদ দিলে জায়গাটি অতি সাধারণ মনে হবে। অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়েছে। এর চেয়ে হাজারগুণ সুন্দর আমাদের বান্দারবানের ছোট আকৃতির যে কোন পাহাড়। অথচ অল্প কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কারণে এরকম সাধারণ পাহাড় রূপ পেয়েছে জনপ্রিয় একটি পর্যটনক্ষেত্র হিসেবে। একেই বলে সৃজনশীলতা।

“দেশের পর্যটন শিল্পকে বেসরকারি খাতে না দিলে কখনোই এ দেশের পর্যটন শিল্পের উন্নতি হবে না”- কে বলেছিল এ কথাটা আমি জানি না তবে কেন যেন দিন দিন আমার এ বিশ্বাস পাকা পোক্ত হয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে আফসোস বাড়ছে। যাদের কাছে বান্দরবানের মতো এমন প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, যাদের কাছে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দর বন আছে, যাদের কাছে কক্সবাজারের মতো বিশাল সমুদ্র সৈকত আছে তাদের অর্থনীতিতে পর্যটন শিল্পের কোনই অবদান নেই!

ম্যান-মেইড নেচার বা মানুষের সৃষ্টি করা প্রকৃতি দেখে আমি প্রভাবিত হই কিন্তু অভিভূত হই না। আমাকে ওয়াইল্ড ন্যাচার বা বন্য প্রকৃতি খুব টানে। বন্য প্রকৃতির মধ্যে কোন বন্যতা থাকেনা। বরং এক ধরনের কোমলতা থাকে। যা হৃদয়-মন- দৃষ্টিকে একসঙ্গে ভীষণ মায়ায় জড়াতে পারে। বারবার মানুষ সেই মায়ায় আপ্লুত হয়ে প্রকৃতির সাথে নিজেকে একাত্ম করার চেষ্টা করে। এ সবুজ রূপ চোখকে এক আশ্চর্যরকম প্রশান্তি দেয়। মনের দৈন্যতা দূর করে হৃদয়কে প্রসারিত করে পৃথিবীকে ভালোবাসতে শেখায় প্রকৃতির এ মায়া।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/টিসি

Advertisement
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন