শনিবার ২৫ মে, ২০১৯ ইং , ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯ রমজান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

টেলিভিশনে আমাদের মায়েদের উপযোগী অনুষ্ঠান থাকছে কী?

মে ১১, ২০১৯ | ৮:৩৬ অপরাহ্ণ

জান্নাতুল ফেরদৌস আইভী

মা দিবসে আমরা সবাই আজকাল নিজ নিজ মায়ের জন্য অনুভূতি লিখতে চাই, বলতে চাই মাকে আমরা কত ভালবাসি। আমিও সেটা বলতে চাই। তবে মুখে বলার থেকে আমার মায়ের জীবনযাত্রায় মিশে গিয়ে আরও বেশি যত্ন করতে চাই। আরও বেশি চাই—যখন মাকে দেওয়ার মতো সময় আমার কমে যেতে থাকে অথবা কোনো কারণে মায়ের সঙ্গে আমার ঝগড়া চলতে থাকে। তখন আমি সতর্কভাবে খেয়াল করি মায়ের সময় কাটছে কতটা অসহায়ভাবে। কেন অসহায় মনে হয়েছে আমার? অসংখ্য গৃহিণী মায়ের মতো আমার মায়ের প্রাত্যহিক জীবনের সময় খুব দ্রুত বয়ে চলছে—তবে কেনো তা অসহায় হয়ে পড়ছে। ভাবলে সত্যিই বড় নিরুপায় এবং অসহায় লাগে আজকাল।

আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন গৃহিণী মায়ের প্রতিদিনের জীবনের রুটিন সাধারণভাবে আমরা সবাই জানি। একজন মা পরিবারের সবার জন্য রান্না করেন। রান্নার সঙ্গে জড়িত সব ধরনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজ যেমন- বাজার থেকে কিনে আনা সবজি পরিষ্কার করে ফ্রিজে রাখা, মাছ-সবজি কেটে ধুয়ে পরিষ্কার করা, পেয়াজ-মরিচ কাটা, সব রকমের মসলা তৈরির পর রান্না করা। এই রান্নার মধ্যে আবার কোনো কোনো মাছের জন্য আলাদা রকমের মসলা। কোনোটায় মশলা কাঁচা, কোনটায় মশলা টেলে নেওয়া, কোনটায় মশলা তেলে ভেজে রান্না করা- এমন যত্ন নিয়ে আমার মা প্রতিদিনের সব খাবার রান্না করেন। সেই সঙ্গে বাড়ির সহকারীকে দিয়ে কাপড় পরিষ্কার করানো, সেগুলো শুকানো, লন্ড্রিতে পাঠানো, ঘরের পর্দা-বিছানার চাদর এগুলো কাঁচানো, বাড়ির কোন কোনায় ময়লা প্রতিদিন সরানো হয়নি সেগুলো সপ্তাহ শেষে ঝাড়-মোছ করানো; এসব এক কোটি কাজ করেন বা করার তদারকি করেন আমার মা। সেই সঙ্গে নিজের শরীরের গ্লুকোজের মাত্রা ঠিক রাখতে নিয়ম করে এক ঘণ্টা হাঁটতে যাওয়া, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া এবং দুবেলা কোরআন পড়া আমার মায়ের প্রতিদিনের রুটিন।

এই সব দায়িত্ব পালন শেষ করে আমার মায়ের নিজের জন্য যে বিনোদনের সময় আমি সেটা নিয়ে খুবই ভাবনায় পড়ি আজকাল। আমার আম্মা বিশেষ কোনো চলচ্চিত্র ছাড়া প্রাত্যহিক অনুষ্ঠানের জন্য হিন্দী বা ইংরেজি বা অন্যকোনো দেশের অনুষ্ঠান দেখতে পছন্দ করেন না। আমাদের দেশের টিভি চ্যানেলের সব অনুষ্ঠান আমার আম্মা দেখেন। খবর ও খবর বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠান যাকে আমরা টক-শো বলি, গানের অনুষ্ঠান, নাটক, সিনেমা, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, প্রামাণ্যচিত্র সবই আমার মায়ের পছন্দের অনুষ্ঠান। তবে এসব অনুষ্ঠানের মধ্যে কতটা আজকাল দর্শকের চাহিদা বিচার করে নির্মাণ হচ্ছে সেটা ভাবার বিষয়।

বিজ্ঞাপন

মাঝ বয়সী অথবা পঞ্চাশ থেকে ষাটোর্ধ বয়সের দর্শকের জন্য আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় কি আলাদা কোনো অনুষ্ঠান প্রচার হচ্ছে আজকাল? হচ্ছে বলে অন্তত আমার জানা নেই। আমার মা নিয়ম করে সকাল ১০টার দিকে খবরের কাগজ পড়েন এবং সন্ধ্যায় টিভিতে খবর দেখেন। এরপর টিভি চ্যানেলে খুঁজতে থাকেন উনার ভালো লাগবে এমন কোনো একটি নাটক বা অনুষ্ঠান দেখার জন্য। আমার মায়ের এই ইচ্ছে আর পূরণ হয় না। কারণ, নাটকগুলো সব যুবক-যুবতীর প্রেমের আর ঝগড়া বিষয়ক ফোনের আলাপ অথবা গ্রাম্য পরিবেশের কিম্ভুতকিমাকার পোশাক পরা ভাঁড়ামিতে পূর্ণ।

এসব অনুষ্ঠান আসলে কোন ধরনের দর্শকের জন্য তৈরি হয় তা বোঝার সাধ্য আমার নেই। যে অনুষ্ঠান আলোচনাভিত্তিক মানে তারকা-আলাপ অথবা সৌন্দর্য বিষয়ক কথা সেখানে উপস্থাপকের ভাষা কেন ইংরেজি বা বাংলা-ইংরেজির মিশেল তা বোঝার ক্ষমতা আমার নেই। কারা এই অনুষ্ঠানগুলো দেখেন? মানে কোনো একটা অনুষ্ঠান কি দর্শক যাচাই করে আজকাল নির্মাণ হয়? আমার তো মনে হয় না।

এসব অনুষ্ঠান কি আজকালের সময়ের উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা দেখে? আমার জানামতে, না। কারণ, এখনকার ছেলেমেয়েরা সারাক্ষণ ব্যস্ত। আমরা যতই তরুণ প্রজন্মকে সমালোচনা করি না কেন, এই প্রজন্মটা নিজেদের গড়তে আর সেই সঙ্গে পরিবারকে সহযোগিতা করতে দিন-রাত কাজ করছে। এমনকি সারাদিনেও ওদের টিভি দেখার সময় নেই। ওরা বাড়িতে থাকলেও হয় নিজের পড়ালেখা করছে না হয় কোনো না কোনোভাবে আউটসোর্সিং-এর কাজ করে নিজেকে গড়ছে। তাহলে এসব উদ্ভট অনুষ্ঠানের দর্শক কারা?

ইংরেজিতে কথা না বলে যদি বাংলায় উপস্থাপনা করতো তাহলে কি দর্শক কম হতো? আমাদের পরিবারে যে অনুষ্ঠান আমার মা দেখেন, সেটা আমরা সবাই দেখি। আমার আম্মা সকালবেলায় ‘সুপ্রভাত’ জানানো যে অনুষ্ঠানগুলো হয় সেটা দেখেন সকালের চা খেতে খেতে। আম্মার সঙ্গে সঙ্গে আমিও দেখি। বহু বছর ধরেই দেখছি। এখন থেকে ১০ বছর আগে যখন আমি আর বাবা একই সময়ে অফিসের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হতাম, তখন অফিস দিনগুলোতে তাড়াহুড়ো করে বের হতাম বলে তা পুষিয়ে নিতাম ছুটির দিনের সকালে। ছুটির দিনে টেলিভিশনে সকালের অনুষ্ঠানগুলোয় একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত অথবা স্নিগ্ধ কোনো গান প্রচার হলে তা শুনতে শুনতে আমরা সকালের নাস্তা করতাম বেশ সময় নিয়ে।

এরপর আমার বাবা প্রায় তিন বছর অসুস্থ ছিলেন। এসময়ে আমার অসুস্থ বাবার যাবতীয় সেবা করতো আমার আম্মা আর ভাইটা। আমি তখনো দেখেছি আমার আম্মা বাসার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে সকালে সেই পছন্দের অনুষ্ঠান চালিয়ে রাখতো। এরপর যখন আমার বাবা মারা গেলেন, মাঝে বেশকিছুদিন বিরতি দিয়ে আম্মা এখন আরও অসহায় হয়ে টিভি চালিয়ে রাখেন যেন সকাল থেকেই মনে হয় সবকিছু আগের মতই আছে। সেই মায়ের জন্য টিভির অনুষ্ঠান যদি হয় সব যুবক-যুবতীর অসুস্থ জীবনযাপন আর অপসংস্কৃতিতে পূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠান, তাহলে আমার মত যাদের পরিবার সেইসব পরিবারের সব মায়েরা আজ বোরড, অসহায় সময় কাটাচ্ছেন।

আমার মন বলে, এটা কেবল আমার পরিবারের গল্প নয়, এটা এই ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত প্রায় সব পরিবারের গল্প। বাড়ির টেলিভিশনই একমাত্র সঙ্গী আমাদের মায়ের জন্য অথবা একজন গৃহিণীর সারা দিনের জন্য। সেখানের অনুষ্ঠানের ভাষা ইংরেজি-বাংলা মেশানো এমন কিম্ভুতকিমাকার হলে তার দর্শক আসলে কারা সেটা ভাবা দরকার।

আমি নিজে চলচ্চিত্র নির্মাতা। আমার চলচ্চিত্র নির্মাণের সব ক্ষেত্রে আমার মা আমাকে পরামর্শ দেন। আমার ‘নীরবে’ চলচ্চিত্রের মূল গল্প নির্মাণে আমার মা-ই আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। আমার মা ইংরেজি জানে না। সরল স্বীকারোক্তিতে বলবো আমার মায়ের সবচেয়ে হীনমন্যতা কাজ করে তিনি ইংরেজি জানেনা না বলে। যে কারণে আমি সব সময়ে আমার মাকে সহযোগিতা করি। এ সহযোগিতার মধ্যে পড়ে, বাড়িতে কেউ বেড়াতে এলে অথবা আমরা কোথাও বেড়াতে গেলে কেউ ইংরেজিতে কিছু বললে আমি আমার মাকে বাংলা শব্দে সেটা বুঝিয়ে বলি। যখন কোনো নাটক বা সিনেমায় কোনো ইংরেজি সংলাপ থাকে সেটার বাংলা করে বুঝিয়ে দেই। এমনকি আমার কোনো আনন্দের অথবা মনখারাপের ই-মেইল পেলে আমি সেটাও আমার মাকে বুঝিয়ে দেই বাংলায় এবং জানতে চাই আমি কি করবো তখন? আমার মা ইংরেজি কম জানেন বলে অথবা জানেন না বলে তার এই রুচিবোধ কোনোভাবেই কম সেটা আমার মনে হয়নি কখনো। এমনকি আমার চলচ্চিত্র নির্মাণের পরামর্শ দেওয়ার সময়ে অথবা টেলিভিশনে কোনো নাটক-সিনেমা-বিনোদন অনুষ্ঠান দেখার সময়েও মনে হয়নি। কিন্তু সেই আমার মাকে যখন দেখছি টিভিতে দেখার মতো একটাও কোনো অনুষ্ঠান প্রচার হচ্ছে না, তখন তা আমাকে খুব অসহায় করে তোলে।

প্রযুক্তির পরিবর্তনের সুফল আমাদের তরুণ প্রজন্মকে যতটা উন্নতির পথে নিচ্ছে, ঠিক ততটাই অসহায় করে তুলছে মধ্যবিত্ত পরিবারের মায়েদের। আমার মা ল্যান্ডফোন ব্যবহার করা সময়ের মানুষ। তিনি এই সময়ের স্মার্টফোনের ব্যবহার জানা দূরে থাক, মোবাইল ফোনের মেমোরি থেকে একটা নাম্বার বের করতে পারেন না। তবুও আমার মা আমাদের তিন ভাই-বোনের খোঁজ রাখেন প্রতিদিন। কীভাবে? কারণ আমার মায়ের তিন সন্তানের নাম্বারই তার মুখস্ত। এমনকি আমার মামা ও খালাদের নাম্বারও। কিন্তু আমার তো আমার মায়ের নাম্বারও মুখস্ত নেই। এটাই বোধহয় এখনকার সময়ের প্রযুক্তি নির্ভর যোগাযোগের সঙ্গে অন্তরের যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্পর্ক।

আমাদের এনালগ মায়েরা স্মার্টফোনে অথবা ল্যাপটপে ইউটিউবে প্রচার হওয়া অনুষ্ঠান দেখেন না। এখনকার প্রজন্মের মধ্যে দেখা যায় ছেলে-মেয়েরা স্মার্টফোন নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত। আমি এই প্রজন্মের সব ভালো দিক সম্পর্কে সাফাই গাইলেও এই একটা দিকে খুব হতাশ যে, মায়েরা কতটা অসহায় অনুভব করছে এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের কাছে থেকে অবহেলা পেতে পেতে। তা ওরা ভেবেও দেখছে না। মায়ের সঙ্গে আলাদা করে সময় দেওয়ার মত সময় নেই এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু প্রতিদিনের জীবনে ওরা খাবার সময়ে, কথা বলার সময়ে মায়ের প্রতি মনোযোগী থাকে না। ওদের মনোযোগ স্মার্টফোনের ইন্টারনেটের প্রতি।

মায়ের বিনোদনের উপায়গুলো যে দিনে দিনে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে সেটা এই প্রজন্মের খেয়াল নেই। কাজেই নীরবে সংকুচিত হতে হতে একজন মায়ের কাছে তাই একটি টিভি অনুষ্ঠানই একমাত্র বিনোদন, তাদের জন্য টেলিভিশনই একমাত্র ভরসা। মা দিবসের অনুভূতি কেবল একটি দিবসে নয়। আমার কাছে বছরের প্রতিটা দিনই মা দিবস। আমার মায়ের সময় কিভাবে কাটে সেটার যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে আমি আমার মায়ের ভাল থাকার জন্য চেষ্টা করি। আমি একা চেষ্টা করে যখন পারছি না, তখন আহ্বান করি টিভি অনুষ্ঠান নির্মাতা এবং সংশ্লিষ্ট সবার কাছে; আমাদের নির্মিত অনুষ্ঠান যদি আমাদের মায়েরা দেখার উপযোগী না হয়, তবে সেই নির্মাতা ‘মা দিবস নিয়ে’ আদিখ্যেতা না করি।

সারাবাংলা/আরএফ

Advertisement
বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন