রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৮ জমাদিউস-সানি ১৪৪১

বিজ্ঞাপন

বিবর্ণ বর্তমান, বর্ণাঢ্য ভবিষ্যৎ

ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২০ | ৬:৫৫ অপরাহ্ণ

প্রভাষ আমিন

৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, রোববার। বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে দিনটি। দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে শক্তিশালী ভারতকে হারিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশ। ক্রীড়া ক্ষেত্রে এটাই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সেরা অর্জন। এর আগে কোনো পর্যায়েই বাংলাদেশ বিশ্বসেরা হতে পারেনি। প্রথমবার ফাইনালে গিয়েই চারবারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়ে দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। তার চেয়ে বড় কথা হলো, জুনিয়র টাইগারদের এ জয় কোনো ফ্লুক নয়। টুর্নামেন্টজুড়েই বাংলাদেশ দারুণ খেলেছে। কোনো ম্যাচ হারেনি। সব ম্যাচ দেখিনি; তবে সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ড এবং ফাইনালে যে স্টাইলে ভারতকে হারিয়েছে তা গর্ব করার মতো।

বিজ্ঞাপন

চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর মাঠে তারা যে উল্লাস-উচ্ছ্বাস দেখিয়েছে; তা একদম তাদেরই বয়সজনিত আনন্দের প্রকাশ। তবে মাঠে তাদের পারফরম্যান্স দেখে বোঝারই উপায় ছিল না, তাদের বয়স উনিশের কম। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, কখন মনে হয়েছে বাংলাদেশ জিতবে? বাংলাদেশের অন্ধ সমর্থক হিসেবে সব ম্যাচেই আমি বাংলাদেশের জয় দেখি, শেষ বল পর্যন্ত আশা ছাড়ি না। কিন্তু অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ফাইনাল সম্পর্কে সব আবেগ সরিয়ে রেখেও বলতে পারি, টসে হেরে ব্যাট করতে নামা ভারতের ইনিংসের ১০ ওভার শেষেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম, আজ দিনটি অবশ্যই বাংলাদেশের। ১০ ওভারে ২৩ রানে এক উইকেট বলেই নয় শুধু, বাংলাদেশি পেসার শরিফুল ইসলাম আর তানজিম হাসান সাকিবের আক্রমণে যে সৌন্দর্য্য ছিল; তা মন কেড়ে নিয়েছিল অনেকেরই। পরে অভিষেক এসে ভারতীয়দের আরও চাপে ফেলে। ১২ ম্যাচ পরে ভারতীয়রা অলআউট হওয়ার গ্লানিতে পরে। ৪৭ দশমিক ২ ওভারে ১৭৭ রানে গুটিয়ে যায় ভারতের ইনিংস।
প্রথম ইনিংস শেষে বাংলাদেশকে জয়ী ভাবার আরেকটি কারণ হলো বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। যে অসাধারণ ফিল্ডিং করেছে বাংলাদেশের যুবারা, তাতেই বোঝা যাচ্ছিল, আজ বাংলাদেশকে ঠেকানোর সাধ্য কারও নেই। জবাবে খেলতে নেমে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা এমন অনায়াসে ব্যাট করছিল, যেন জয় কোনো ব্যাপারই না। বাংলাদেশের প্রথম উইকেট পড়ে নবম ওভারের পঞ্চম বলে, ততক্ষণে ৫০ হয়ে গেছে। তানজিদ হাসানের উইকেটটিকে তখনও অত গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছিল না। কিন্তু লেগ স্পিনের বিস্ময় নিয়ে আসা রবি বিঞ্চয় টানা চার উইকেট নিয়ে আতঙ্ক ছড়ায় বাংলাদেশ ইনিংসে। পারভেজ হোসেন ইমন যেভাবে পেশীর টান নিয়েও খেলে গেছেন, তাতে কার সাধ্যি রুখে দেয় বাংলাদেশকে।

তবে সত্যিকারের নায়ক হলো আকবর আলী, আকবর দ্যা গ্রেট। যেভাবে ঠান্ডা মাথায় দলকে জয়ের বন্দরে নিয়ে গেছেন, বাংলাদেশের কারও কাছ থেকে অনেকদিন এমন পরিণত ইনিংস দেখিনি। ১১১ বলে ৩৫ রান দরকার, হাতে তিন উইকেট; এমন সময়েও টানা ২৫ বলে ব্যাট থেকে কোনো রান আসেনি। ভাবা যায়! সিনিয়ররা হলে চার ছক্কা মেরে দলকে জেতাতে গিয়ে হার ত্বরান্বিত করতো। তীরে এসে তরি ডোবানোর এমন অনেক উদাহরণ আছে। মুশফিকের রহিমের মতো মিস্টার ডিপেন্ডেবলও ছক্কা মারতে গিয়ে এশিয়া কাপ খুইয়ে বসেন। সেখানে আকবরের মতো পুঁচকে কীভাবে এসন সংযমী হন, লোভের ফাঁদ এড়িয়ে পৌঁছে যান জয়ের বন্দরে আমার মাথায় ঢোকে না। তাকে দেখে আমার স্টিভ ওয়াহর ইস্পাত নার্ভের কথা মনে পড়ছিল বারবার। আকবর আলীর মধ্যে একবারও নায়ক হওয়ার বা গ্যালারি শো করার কোনো চেষ্টাই ছিল না। তার একটাই কাজ ছিল পরিস্থিতির দাবি বুঝে ব্যাট চালিয়ে যাওয়া এবং দলকে জেতানো। এমন বারুদে ম্যাচে মাথায় এমন বরফ পুড়ে রাখা কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব। সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন আকবর দ্যা গ্রেট।

বিজ্ঞাপন

প্রথম ১০ ওভারেই যে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত, সেই ম্যাচও যে এমন উপভোগ্য হলো- তার কারণ, প্রতিপক্ষ ভারত। তারা একবারের জন্যও হাল ছাড়েনি। তাই তো ম্যাচের ভাগ্য বারবার বদলেছে। ফাইনালটিকে দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার জন্য ভারতীয় যুবাদেরও অভিনন্দন জানাতে হবে।

পচেফস্ট্রুমে বাংলাদেশের যুবারা যখন ভারতকে নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছে, তখনই রাওয়ালপিন্ডিতে সিনিয়র টাইগারদের পিণ্ডি চটকাচ্ছিল এক পুঁচকে পাকিস্তানি। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলতে যার দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার কথা ছিল, সেই নাসিম শাহ হ্যাটট্রিক করে ধ্বসিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের ইনিংস। ১৬ বছর বয়সী নামিস শাহ এখন টেস্ট হ্যাটট্রিকে সবচেয়ে কম বয়সী।

জুনিয়র টাইগাররা যেদিন ভারতকে হারিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলো, তার পরদিন সিনিয়র টাইগাররা পাকিস্তানের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে। আমি বলছি না যে, একটি পরাজয়েই বাংলাদেশ ক্রিকেট শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু পাকিস্তানের কাছে এমন অসহায় আত্মসমর্পণ দেখতে ভালো লাগে না। আমি শুধু বলছি, সিনিয়র টাইগারদের কাছে যেন আকবর আলীর ৪৩ রানের ইনিংসটির ভিডিও পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরিস্থিতির দাবি মেনে কীভাবে ব্যাটিং করতে হয়, তার একটি শিক্ষামূলক ক্লাশ হতে পারে এটি। রাওয়ালপিন্ডি আর পচেফস্ট্রুম আমাদের ক্রিকেটের দুই রূপ দেখিয়ে দিল। দেখলাম বিবর্ণ বর্তমান, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। তবে যে পঞ্চপাণ্ডবে ভর করে দীর্ঘদিন চলছে বাংলাদেশ ক্রিকেট, তা এখন এলোমেলো প্রায়। মাশরাফি অনেক আগেই টেস্ট ছেড়েছেন। সাকিব নিষিদ্ধ। মুশফিক পাকিস্তান যাননি। অধিনায়ক মুমিনুল নতুন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন হালছেঁড়া তরী। ভরসা হলো, তরুণরা উঠে আসছেন। এখন যারা অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলছেন, দুই বছর পর তারাই জাতীয় দলে খেলবেন। মাশরাফি-সাকিব-তামিমের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবেন শরিফুল-ইমন-আকবর আলীরা।

কিন্তু আমার শঙ্কাটা অন্যখানে। এই যুবারা ততদিন ভালো থাকবেন তো? বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকেই সব দেশের মূল দলের ভিত্তি তৈরি হয়। কিন্তু বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে আমরা অন্যদলের সাথে সমান তালে লড়লেও মূল দলে যেতে যেতে পার্থক্যটা অনেক বেড়ে যায়। অনূর্ধ্ব-১‌৯ থেকে ভারত পায় বিরাট কোহলি, আমরা পাই সাব্বির, নাসির। এই সমস্যার উৎসটা খুঁজে বের করতে হবে। নইলে এই অনূর্ধ্ব-১৯-এর সাফল্যেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

আগেই বলেছি, অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ শিরোপা কোনো ফ্লুক নয়। আমরা যোগ্য দল হিসেবেই জিতেছি। কীভাবে বাংলাদেশের তরুণরা যোগ্য হয়ে উঠলো? তরুণরাই বলছেন, তাদের সাফল্যযাত্রার কথা। দুই বছর ধরে এই টিমটি বিশ্বকাপ শিরোপাকে পাখির চোখ বানিয়েছে। দুইবছর ধরে তারা একসঙ্গে। কঠোর পরিশ্রম, নিয়মিত অনুশীলন আর যুথবদ্ধতা তাদের এক পরিবার বানিয়ে দিয়েছে; যোগ্য করে তুলেছে। এখন তাদের এই সাফল্যক্ষুধা জাগিয়ে রাখতে হবে। এখানেই আমাদের সংগঠকদের কাজ। শচিন টেন্ডুলকার আর বিনোদ কাম্বলি স্কুল ক্রিকেটে জুটির বিশ্বরেকর্ড করেছিলেন। তখন সবাই বলাবলি করছিল, কাম্বলি শচিনের চেয়েও প্রতিভাবান। কাম্বলির প্রতিভার ঝলক বিশ্ব ক্রিকেট দেখেছেও। কিন্তু তার প্রতিভার ঝলক পলকেই ফুরিয়ে যায়। অর্থ-যশ-খ্যাতির মোহে কাম্বলির ক্রিকেট হারিয়ে গিয়েছিল। আর তার চেয়ে ‘কম প্রতিভা’ধর শচিনের আলোয় আলেকিত হয়েছে গোটা বিশ্ব। এখন আমাদের যুবারা কাম্বলি হবেন না শচিন, সেটা ঠিক করার দায়িত্ব কিন্তু বোর্ডের।

সংবর্ধনা, পুরস্কার ও প্রশংসায় যেন আমরা তরুণ এই ক্রিকেটারদের ফোকাসটা নষ্ট না করে দেই। খ্যাতির আলোতে যেন তাদের চোখ ঝলসে না যায়। বোর্ডের উচিত হবে, তাদের দিকে নজর রাখা, তাদের পরিচর্যা করা। তাদের সবধরনের সমস্যার সমাধানের গ্যারান্টি দিতে হবে। তরুণদের বোঝাতে হবে শুধু ভালো খেললেই ভালো ক্রিকেটার হওয়া যায় না। চেষ্টা করতে হবে, বাগানের সবগুলো ফুলই যেন ফোটে, সব প্রতিভাই যেন বিকশিত হয়। তবে সব কুড়ি সবসময় ফুল হতে পারে না, ঝরে যায়। মালি ভালো হলে ঝরে পড়ার সংখ্যা কম হয়, ফুলের সংখ্যা বাড়ে। আর বেশি ফুল ফোটাতে পারলেই আাগামী দেড় দশকের জন্য নিশ্চিন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট। বিবর্ণ বর্তমান ভুলে উজ্জ্বল ও বর্ণাঢ্য ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করতে পারব।

লেখক: বার্তা প্রধান, এটিএননিউজ

সারাবাংলা/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন