বিজ্ঞাপন

‘ধর্ষণে বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান, যুগোপযোগী আইন জরুরি’

October 9, 2020 | 9:23 am

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ধর্ষণ বন্ধের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এখন শক্ত অবস্থান নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি দিয়ে ধর্ষণকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। সময় এসেছে ধর্ষণ ও এ সংক্রান্ত অপরাধকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার, আইনের আধুনিকায়ন করার। তাছাড়া আইনে যা কিছু আছে, প্রয়োগের ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন থাকতে হবে। নারী ও শিশু বিষয়ক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল যা রয়েছে, সেগুলোর দিকে আমাদের আলাদাভাবে নজর দিতে হবে। দ্রুত বিচার করতে হবে। ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ না করতে পারলে ধর্ষককের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকবে।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাতে সারাবাংলা ডটনেটের নিয়মিত আয়োজন ‘সারাবাংলা লিগ্যাল চেম্বার’ অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীন। লিগ্যাল চেম্বারের এ পর্বের আলোচনার বিষয় ছিল— ‘ধর্ষণ: অভিযোগ, আইন ও বিচার ব্যবস্থা’।

একজন নারী ধর্ষণের শিকার হলে আইনে শাস্তির কী বিধান রয়েছে, ধর্ষণের মামলা নিতে পুলিশ অস্বীকার করলে কী করতে হবে— এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় এ পর্বে। সারাবাংলা ডটনেটের পক্ষে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ব্যারিস্টার ইফ্ফাত  গিয়াস আরেফিন।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দণ্ডবিধি তথা পেনাল কোড ১৮৬০-তে ধর্ষণের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এই দণ্ডবিধি ছাড়াও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির সাজা নির্ধারণ করা রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনটি ২০০০ সালে প্রণয়নের পর ২০০৩ সালে সংশোধন করা হয়েছে। এই আইনের ৯ (১) ও পেনাল কোডের ৩৭৬ ধারাতে ধর্ষণের সাজা সম্পর্কে বলা হয়েছে।

আইন ধর্ষণের সংজ্ঞায়ন নিয়ে জটিলতা রয়েছে জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসলিমা বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ সালে প্রণয়ন করা হলেও ধর্ষণের সংজ্ঞা এখনো নির্ধারণ করতে হয় ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি অনুযায়ী। ফলে বিশ্বের বহু দেশে ধর্ষণ ও এ সম্পর্কিত অপরাধকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, আমরা তার থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছি।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ধর্ষণকে ঠিকমতো সংজ্ঞায়ন করা হচ্ছে না কোথাও। সেক্সচুয়াল হ্যারাসমেন্ট বা যৌন হয়রানি সম্পর্কে দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারা থাকলেও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩ সালে এ ধরনের অপরাধের সংজ্ঞায়ন ঠিকমতো করা হয়নি। আবার ১৩ বছরের কোনো শিশু স্বামীর কাছে ধর্ষণ হলে ধর্ষণের মামলা করা হয় না। এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজকরা দরকার। ধর্ষণ বাদে অন্য ধারাগুলোতে পরিবর্তন আনতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে শ্লীলতাহানি সংক্রান্ত ৯ নম্বর ধারা এবং পেনাল কোডের ৫০৯ ধারাসহ ওভারঅল ধারাগুলোর রিভিউ করা দরকার।

তাসলিমা ইয়াসমীন বলেন, ধর্ষণের জন্য আইন থাকলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রটি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। ধর্ষণের বিচার সঠিকভাবে করার জন্য একটি মনিটরিং সেল থাকা জরুরি। সেই মনিটরিং সেলটি গঠন হবে সুপ্রিম কোর্টের মধ্যেম। বিচারক, তদন্ত কর্মকর্তা, পাবলিক প্রসিকিউটরইসহ অন্য বাক্তিরাও যেন সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন— সেটি এই সেল দেখবে। আর ধর্ষণ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন

ধর্ষণ মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানালে বাদী সরাসরি আদালতে গিয়ে মামলা দায়ের করতে পারেন বলে জানান ঢাবি’র এই সহযোগী অধ্যাপক। তিনি বলেন, পুলিশ যদি ধর্ষণের মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে গিয়ে সরাসরি এফআইআর দায়ের করা যাবে। ম্যাজিস্ট্রেট চাইলে সরাসরি জুডিশিয়ারির ইনকোয়ারি করতে পারেন। সেখানেও যদি মামলা নেওয়া না হয়, তাহলেও প্রতিকারের সুযোগ আছে। এ আইনের ৩১(ক) ধারায় বলা হয়েছে— যদি কোনো পাবলিক প্রসিকিউটর, ম্যাজিস্ট্রেট বা তদন্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন, তাহলে সু্প্রিম কোর্টের কাছে রিপোর্ট করা যাবে। তবে এই ধারা থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ নেই বললেই চলে। তাছাড়া আমাদের আইনের বিভিন্ন ধারায় অনেক গ্যাপ রয়েছে। সেগুলো রিভিশন করা দরকার।

ধর্ষণ মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে জবাবহিদিতা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তাসলিমা ইয়াসমীন। তিনি বলেন, ধর্ষণের অনেক মামলা হয়। তবে সাক্ষীর জন্য বিচার শেষ করতে অনেক সময় লেগে যায়। ইচ্ছা থাকলেও বিচারকাজ দ্রুত করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। যদি সুপ্রিম কোর্ট দ্বারা মনিটরিং বডি তৈরি করে মামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মনিটরিং ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যেত, তাহলেই দ্রুত বিচার হওয়া সম্ভব হতো।

বিজ্ঞাপন

ধর্ষণ বন্ধে রাষ্ট্রকে আরও কঠোর হতে হবে জানিয়ে ঢাবি’র এই শিক্ষক বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের ফলে মৃত্যু হলে তবেই ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের বিধাান রয়েছে। তাছাড়া ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এখন এই শাস্তির বিধান পরিবর্তনের সময় এসেছে। ধর্ষণ বন্ধে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শক্তিশালী অবস্থান নেওয়া এখন সময়ের দাবি। আইনে কিছু সংশোধন আনা প্রয়োজন। তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন আইনে যা কিছু আছে, তার সঠিক প্রয়োগ ও প্রতিফলন।

তিনি বলেন, ধর্ষণকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। ধর্ষকের জন্য আরও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ধর্ষণ মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তা না করতে পারলে আইন থেকে যাবে আইনে জায়গাতে। ধর্ষকদের সংখ্যা কেবল বাড়তে থাকবে। নারী ও শিশু প্রতি সহিংসতা বিষয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল রয়েছে, সেগুলোর দিকে আলাদাভাবে নজর দিতে হবে। দ্রুত বিচার করতে হবে। ধর্ষণে সংক্রান্ত আইনের আধুনিকীকরণ এবং লিঙ্গ নির্ধারণে পরিবর্তন আনতে হবে।

সারাবাংলা/এআই/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন